দারিদ্র্যে আটকে আছে জয়নব ও উম্মে কুলসুমের নতুন জীবনের স্বপ্ন

আপলোড সময় : ৩১-০৭-২০২৬ , আপডেট সময় : ৩১-০৭-২০২৬
 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জন্ম নেওয়া জোড়া লাগা যমজ কন্যাশিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুমের নতুন জীবনের স্বপ্ন এখন দারিদ্র্যের মাঝে আটকে আছে। বুক থেকে পেট পর্যন্ত একসঙ্গে যুক্ত এই দুই শিশুকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করার সম্ভাবনা দেখছেন চিকিৎসকেরা। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় তাদের ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। অসচ্ছল পরিবারটি এখন সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতার আশায় দিন গুনছেন।

দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ দুই কন্যাশিশু। কিন্তু কাছে গেলেই চোখ আটকে যায়—বুক থেকে পেট পর্যন্ত একসঙ্গে জোড়া লাগানো যমজ বোন জয়নব ও উম্মে কুলসুম। জন্মের পর থেকেই তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া যেন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, একজন নড়লে অন্যজনও ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের বাসিন্দা নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় এই বিরল যমজ শিশুর।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসকেরা আশা দিয়েছেন যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দুটিকে আলাদা করা সম্ভব। তবে তার আগে প্রয়োজন একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত চিকিৎসা। জন্মের তিন মাস পর আবার ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে এখনও পরিবারটির পক্ষ থেকে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান একসময় রাজধানীতে পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। মাসে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয়ে কোনোমতে সংসার চালাতে হয় তাকে। এরই মধ্যে শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বেড়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদ হাসান বলেন, ‘ডাক্তাররা আশা দিয়েছেন, আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব, কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এখন তাদের দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

মা সানজিদা আক্তার বলেন, ‘ওদের আলাদাভাবে কোলে নেওয়া যায় না। একজন একটু নড়লেই অন্যজন কষ্ট পায়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত ও পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।’

তাদের স্বজন মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘এই দুই শিশুকে বাঁচাতে হলে সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি। সবার সহযোগিতা পেলে হয়তো ওরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।’

স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, জোড়া লাগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। আধুনিক চিকিৎসায় সফল অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা থাকলেও এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজন।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, ‘চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। যথাসময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকলে শিশু দুটির চিকিৎসার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে।’

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, ‘শিশু দুটির চিকিৎসায় উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আমরা কাজ করছি।’

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই পরিবারের এখন একটাই স্বপ্ন—জয়নব ও উম্মে কুলসুম একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা হতে পারে নিষ্পাপ এই শিশু দুটির নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :