হুমায়ুন কবির, খোকসা (কুষ্টিয়া): কুষ্টিয়ার খোকসায় দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নারিকেল গাছে কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা মিলিয়ে এলাকায় মোট ৯ হাজার ৪৮০টি নারিকেল গাছ থাকলেও এর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ গাছই এখন অকেজো ও ফলহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বসতবাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা রাস্তার ধারের এসব গাছ থেকে কোনো আয় না হওয়ায় চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। ফলন না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে পুরোনো গাছ কেটে ফেলছেন, আর নতুন করে দেশীয় জাতের চারা রোপণে দেখা দিয়েছে চরম অনীহা। তবে বৈচিত্র্য আনতে শখের বশে কেউ কেউ ভিয়েতনামী জাতের নারিকেলের চারা রোপণ করছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওসমানপুর ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ১,৩০০টি, শিমুলিয়ায় ১,২৫০টি, সমষপুরে ১,১৫০টি এবং পৌরসভা এলাকায় ১,১৭৫টি নারিকেল গাছ রয়েছে। এছাড়া খোকসা ইউনিয়নে ১,১২০টি, জয়ন্তীহাজরায় ৮৫০টি, গোপগ্রামে ৭২৫টি, বেতবাড়িয়ায় ৭০০টি, জানিপুরে ৬৫০টি এবং আমবাড়ীয়া ইউনিয়নে ৫৬০টি গাছ রয়েছে। কিন্তু কাগজে-কলমে গাছ থাকলেও বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; অধিকাংশ গাছই এখন ফলশূন্য।
স্থানীয় চাষিরা জানান, গাছে ফুল ও গুটি এলেও তা অল্প দিনের মধ্যে ঝরে পড়ে। এছাড়া মাছি পোকার আক্রমণ ও কচি পাতা পচে যাওয়া এ সংকটের অন্যতম কারণ। ফল ঝরে পড়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে অনেক চাষি কচি থাকতেই ৮০ থেকে ১০০ টাকায় ডাব বিক্রি করে দিচ্ছেন। একসময় সমষপুর ও জানিপুর বাজারে ঢাকা থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে নারিকেল কিনতে আসতেন। বর্তমানে দু-একজন চাষি বাজারে নারিকেল আনলে প্রতিটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১১০ টাকা।
সামনেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। পূজায় নারিকেলের প্রচুর চাহিদা থাকলেও বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। জোড়া নারিকেল কিনতে ক্রেতাদের আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের কাছে বায়না বা অর্ডার দিয়ে রাখতে হচ্ছে। স্থানীয় নারিকেল ব্যবসায়ী প্রদীপ পোদ্দার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আগে ট্রাকে লোড দিয়ে তেল কোম্পানির জন্য ঢাকায় নারিকেল পাঠাতাম। আর এখন সপ্তাহে বাজারে মাত্র ৮-১০টি নারিকেল মেলে, যা দিয়ে স্থানীয় চাহিদাই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।”
এদিকে সমস্যার কারণ হিসেবে কৃষকদের একাংশ এলাকাটিতে স্থাপিত মোবাইল টাওয়ারের তরঙ্গকে দায়ী করছেন। সাতপাখিয়া গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান ও গাছি সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, টাওয়ার বসানোর পর থেকেই এই ফলন বিপর্যয় শুরু হয়েছে।
তবে কৃষকদের এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা খোকন হোসেন বলেন, “টাওয়ারের কারণে ফলন না হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। দীর্ঘদিন ফল দেওয়ার পরও চাষিরা গাছে সুষম সার না দেওয়ায় গাছগুলো তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বর্ষার শুরুতে ও শেষে নিয়ম মেনে সার দেওয়া জরুরি।”
অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, মাইজ পোকার আক্রমণ ও ভাইরাসের কারণে মূলত নারিকেলের গুটি ঝরে পড়ে এবং কচি পাতা পচে যায়। সঠিক নিয়মে বোরন সার প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক স্প্রে করলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। সংকট নিরসনে কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।