ঢাকাসহ সারা দেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। আসামি গ্রেফতারে বাধা, হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের হামলায় আহত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। সবশেষ রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারে সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি আঘাতে নিহত হয়েছেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেন।
পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে পৃথক হামলায় অন্তত ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়।
হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৮২ জন, মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ জন, জুনে ৫১ জন এবং জুলাইয়ে ৪২ জন পুলিশ সদস্য হামলায় আহত হয়েছেন।
এর আগের বছর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলায় আহত হন ৬০১ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, মার্চে ৯৬, এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪, জুলাইয়ে ৩৯, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ এবং ডিসেম্বরে ৪১ জন আহত হন।
পুলিশের মনোবল দুর্বল করতে হামলার অভিযোগ
সাভারে উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেন হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরিদর্শক কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশের মনোবল দুর্বল করতে ইউনিফর্মধারী পুলিশকে পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশকে দুর্বল ভেবে যারা আঘাত করছে, তাদের আমরা আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবো।’
তিনি আরও বলেন, পুলিশ জনগণের কল্যাণেই কাজ করে। পুলিশের ওপর হামলা হলে জনগণের উচিত তা প্রতিহত করতে সহযোগিতা করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের উচিত পুলিশের কাজে সহযোগিতা করা এবং পুলিশ পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার মুখে পড়লে এগিয়ে আসা।
ছিনতাইকারী কিংবা উগ্রবাদীদের হামলারও শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর ২০২৫-২৬ সালে পুলিশের ওপর আক্রমণ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। ছিনতাইকারী কিংবা উগ্রবাদীদের হামলারও শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেট এলাকায় পুলিশের একটি নিয়মিত তল্লাশি চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। তল্লাশির সময় একদল যুবক দায়িত্বরত এক পুলিশ কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করে এবং ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল, বোমাভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম তদন্ত করে জানতে পায়, ঘটনার সঙ্গে উগ্রবাদী সংগঠন নব্য জেএমবির সন্ত্রাসীরা জড়িত।
চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ধানমন্ডি থানা পুলিশের একটি দল হামলার শিকার হয়। বাধ্য হয়ে পুলিশ গুলি চালালে এক ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। এর আগে রাজধানীর পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলামসহ পুলিশের তিন কর্মকর্তা আহত হন।
মার্চে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অভিযানের সময় যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান।
ঢাকার বাইরেও ঘটছে হামলার ঘটনা
রাজধানীর বাইরেও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলাকারীদের ছোড়া ইটপাটকেল ও ককটেল বিস্ফোরণে খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমসহ পুলিশের অন্তত ছয় সদস্য আহত হন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে গুলিতে একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পটুয়াখালী সদর উপজেলার লাউকাঠিতে দুইপক্ষের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শহিদুল ইসলাম নামে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। তাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করার পাশাপাশি রড দিয়েও পেটানো হয়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় পুলিশের তিন উপপরিদর্শকসহ চার পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। আহতরা হলেন আফজালুর রশিদ, জসীমউদ্দীন, খোরশেদ আলম ও সোহেল।
আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে
শুধু হামলাই নয়, বিভিন্ন এলাকায় পুলিশকে আক্রমণ করে হেফাজত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দামোধরদপী পয়েন্টে একাধিক মামলার আসামি আসির মিয়াকে পুলিশ হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আসামির স্বজন ও সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা ও ধস্তাধস্তি করে তাকে ছিনিয়ে নেয়। পালিয়ে যাওয়ার পর আসির মিয়া তার ফেসবুক আইডি থেকে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় লাইভেও আসে।
তবে পরবর্তী সময়ে ৩ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও সদর থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে শহরের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে আবার গ্রেফতার করে।
জুলাইয়ে নরসিংদীর চরাঞ্চলে হত্যাসহ তিন মামলার আসামি সেলিম মুন্সিকে গ্রেফতার করে থানায় নেওয়ার পথে স্থানীয় ৪০-৫০ জন লোক লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। এতে পুলিশ সদস্যরাও আহত হন।
বছরের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ ও বাগেরহাটেও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সেখানে দায়িত্বপালনকারী বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
এর বাইরে মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা এলাকায় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক
এদিকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দিন সম্রাট বলেন, ‘আইনের রক্ষক পুলিশ যদি হামলার শিকার হয়, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে? দ্রুত এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের। না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ছিনতাইকারী, ফেরারি আসামি ও মাদক কারবারিরাও যখন-তখন পুলিশের ওপর হামলা করছে, যা উদ্বেগের বিষয়। দেশ ও মানুষের সার্বিক কল্যাণ এবং শান্তির কথা বিবেচনা করে আইন প্রয়োগে পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। না হলে দেশে অরাজকতা ক্রমশ বাড়বে।