জবাবদিহিতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ

আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬

এসএম শহীদুল্লাহ: উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে এবং দক্ষ নেতৃত্বের সংকট কাটাতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রণীত “খসড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬” নিয়ে দেশের পেশাজীবী ও প্রশাসনিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। এই নীতিমালায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে একদিকে যেমন ইতিবাচক মত এসেছে, অন্যদিকে এর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশের প্রকৌশলী সমাজ।

দেশের সর্ববৃহৎ প্রকৌশলী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সমাজের মতে, প্রকল্প পরিচালক পদটি কোনো সাধারণ দাপ্তরিক বা রুটিনমাফিক চেয়ার নয়। বিশেষ করে সড়ক, সেতু, ভবন বা বিদ্যুৎ খাতের মতো কারিগরি প্রকল্পে পিডিকে সরাসরি নকশা, স্পেসিফিকেশন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কনট্রাক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং জটিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারিগরি জ্ঞানহীন কোনো ব্যক্তিকে এই পদে দায়িত্ব দিলে তা প্রকল্পের গুণগত মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

প্রকৌশলী সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি দপ্তরগুলোতে বর্তমানে বহু মেধাবী ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলী কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সরকারি বিধি-বিধানের বাস্তব জ্ঞান রয়েছে। বাইরের লোক বা অবসরপ্রাপ্ত জনবল দিয়ে নিয়মিতভাবে পিডি পদের ঘাটতি পূরণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সংস্থাগুলোর নিজস্ব প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বা 'প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাসিটি' গড়ার প্রক্রিয়া চিরতরে বাধাগ্রস্ত হবে।

চুক্তিভিত্তিক বা বেসরকারি ব্যক্তিদের পিডি হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে জবাবদিহিতা। প্রকল্প চলাকালীন বা সমাপ্তির পর আর্থিক অনির্মাণ, ক্রয় দুর্নীতি কিংবা কাজের মান খারাপ হলে এই চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের কীভাবে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে-নতুন খসড়া নীতিমালায় তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া, বেসরকারি খাতের কোনো পেশাজীবী অতীতে কোনো ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তা স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের এই উদ্যোগকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনতে এবং যোগ্য লোকের ঘাটতি দূর করতে বেসরকারি খাত থেকে পিডি নেওয়ার উদ্যোগটি ভালো। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নিয়োগের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হতে হবে। এটি যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক লবিং বা নিজেদের পছন্দসই লোক পুনর্বাসনের মাধ্যম না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখার তাগিদ দেন তিনি।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় বিশেষায়িত প্রকল্পের ক্ষেত্রে যোগ্যতার কিছু শর্ত শিথিল করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তার তীব্র বিরোধিতা করেছে প্রকৌশল সমাজ। তাদের মতে, শর্ত শিথিল না করে বরং প্রকল্পের প্রকৃত প্রকৃতি অনুযায়ী কঠোর ও সুনির্দিষ্ট কারিগরি যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত। এছাড়া, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

দেশের প্রতিটি মেগা ও সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি ফোটা অর্থ জনগণের কষ্টার্জিত আমানত। তাই খসড়া নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে আইইবি-সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে একটি ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ কাঠামোর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :