এস.এম লুৎফুর কবির, কক্সবাজার ব্যুরো : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং এলাকার হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও সরু যোগাযোগপথকে আধুনিক সড়কে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই জনকল্যাণমূলক সড়ক নির্মাণকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ের আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা ও নানা বাধা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে যে পথ দিয়ে এলাকার মানুষ চলাচল করে আসছেন, সেই পথের উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন অজুহাতে তা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনগণ। তাঁদের দাবি, সড়ক নির্মাণে কোনো কারিগরি বা প্রশাসনিক সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হোক; কিন্তু জনস্বার্থের প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম দুর্ভোগ:
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হারবাংয়ের এই যোগাযোগপথটি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান চলাচলের মাধ্যম। কোথাও কাঁচা, কোথাও ইট বিছানো সরু পথ দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকে চলাচল করতে হয়।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কাদামাটি ও জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারজাত করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতেও তৈরি হয় ভোগান্তি।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, এক-দুই বছর নয়, বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একটি ভালো সড়কের অপেক্ষায় রয়েছেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই দুর্ভোগ বহন করে আসছেন এলাকার মানুষ।
সড়ক হলে বদলে যাবে এলাকার চিত্র:
প্রস্তাবিত সড়কটি বাস্তবায়িত হলে হারবাং ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিতে পারবেন। কমবে পরিবহন ব্যয় ও সময়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে। একই সঙ্গে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের দুর্ভোগ কমবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা একটি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করে। নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
বাধা নয়, প্রয়োজন সমাধান:
সড়ক নির্মাণ নিয়ে যেসব আপত্তি বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের বক্তব্য স্পষ্ট—সমস্যা থাকলে তার সমাধান করতে হবে, উন্নয়ন বন্ধ করা নয়।
তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর এক টেবিলে বসে প্রকল্পের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে পারে। প্রয়োজন হলে কারিগরি পরিবর্তন, নকশা সংশোধন কিংবা বাস্তবসম্মত বিকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটি আটকে গেলে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের।
এলজিইডি কক্সবাজারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আশাবাদ:
সড়কটি বাস্তবায়নে এলজিইডি কক্সবাজারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিলেও তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নয়নকাজে কখনো কখনো প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধান করে জনগণের প্রত্যাশিত সড়কটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
এলজিইডির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন পর একটি কার্যকর উদ্যোগ সামনে এসেছে। এখন প্রয়োজন সব পক্ষের ইতিবাচক সহযোগিতা।
‘আমরা সড়ক চাই, উন্নয়ন চাই’:
হারবাংয়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা কোনো বিরোধ চান না। তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান।
স্থানীয় একজন বাসিন্দার ভাষায়, ‘আমরা উন্নয়ন চাই। নিয়ম মেনে সড়ক হোক। কোনো সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্টরা বসে সমাধান করুক। কিন্তু আমাদের সড়কটি বন্ধ হয়ে যাক—এটা আমরা চাই না।’
আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের স্কুলে যেতে কষ্ট হয়, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে কষ্ট হয়, কৃষকের পণ্য বাজারে নিতে কষ্ট হয়। একটি ভালো সড়ক হলে এসব সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।’
হাজারো মানুষের প্রত্যাশা এখন সড়ক বাস্তবায়নে:
হারবাংয়ের সড়কটি শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়—স্থানীয়দের কাছে এটি দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও প্রয়োজনের প্রতীক। তাই কোনো ধরনের বিরোধ বা জটিলতার কারণে প্রকল্পটি থেমে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এলজিইডি কক্সবাজারের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সহযোগিতায় সড়কটি বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
শত বছরের জনদুর্ভোগ লাঘবের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হারবাংয়ের হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রায় আসতে পারে দৃশ্যমান পরিবর্তন। এখন স্থানীয়দের চোখ সড়কের দিকে—কবে শেষ হবে অপেক্ষা, কবে বাস্তব হবে একটি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার স্বপ্ন।