সাত বছরেও শেষ হয়নি আবরার হত্যার বিচার, রায় কার্যকরের আশায় বৃদ্ধ মা-বাবা

আপলোড সময় : ০৭-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৭-১০-২০২৬ ০৫:১২:১৭ অপরাহ্ন

আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল, হাইকোর্টেও পরে সেই দণ্ড বহাল থাকে। কিন্তু বিচারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। বহুল আলোচিত ও নৃশংস এ হত্যা মামলা বর্তমানে আপিল বিভাগে আসামিদের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

আবরারের পরিবার সাত বছর ধরে অপেক্ষা করছে। তাদের ভাষ্য, আদালত একের পর এক রায় দিলেও সেই অপেক্ষার শেষ হচ্ছে না। বিশেষত রায় কার্যকরের অগ্রগতি নিয়ে এখন তারা হতাশ।

আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন, তাঁর ভাইকে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই নয়, নাড়া দিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও। তিনি দাবি করেন, আবরার হত্যার পর মানুষের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, পরের রাজনৈতিক পরিবর্তনে তার প্রভাব পড়েছিল।

মুঠোফোনে ফাইয়াজ বলেন, ফ্যাসিবাদ বিদায়ের সূচনা হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই। অথচ যাদের কারণে আজকের এই পরিবর্তন এসেছে, সেই হত্যার বিচারই এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি।

ফাইয়াজ জানান, হাইকোর্ট ২০২৫ সালের মার্চে রায় দেওয়ার পরও তাঁদের অপেক্ষা চলছে। নানা জায়গায় যোগাযোগ করা হলে তাঁদের বলা হয়, মামলা এগোয় সিরিয়াল অনুযায়ী।

তিনি বলেন, সিরিয়াল এগিয়ে আনার সুযোগ আছে। তবে সিরিয়াল এগিয়ে আনতেও তাঁদের দ্বিধা হয়। যেসব জায়গায় যোগাযোগ করা প্রয়োজন, পরিবারের পক্ষ থেকে সেখানে যোগাযোগ করা হয়েছে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করার নেই।

ফাইয়াজ প্রশ্ন তোলেন, রায় কার্যকরের পথে বাধাটা কোথায়; তাঁদের পরিবার তা জানে না। এখন তাঁদের মনে হচ্ছে, এটি অবহেলা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্য সচিব সুলতান মাহমুদ তালহা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই। সেই ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, আর ফাহাদের হত্যার ওপর দাঁড়িয়ে সুবিধা নিচ্ছে নতুন সরকার। আবরার ফাহাদ হত্যার আসামিদের রায় কার্যকর করা তাদের উচিত। এই দাবি কেবল তাঁর নিজের নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের; রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।

আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহর কণ্ঠেও একই ক্ষোভ। তিনি মুঠোফোনে বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই আবরার হত্যা মামলার গুরুত্বও কমে যায়। আসামিদের রায় কার্যকর হোক, এটি কেবল তাঁর পরিবারের চাওয়া নয়, গোটা বাংলাদেশের মানুষেরই চাওয়া। এরপরও রায় কার্যকর হচ্ছে না। এ নিয়ে তিনি একা নন, দেশের সব মানুষই হতাশ।

তাঁর ভাষ্য, সুষ্ঠু বিচার তাঁরা এখনো পাননি। বিচারের কাজ যাতে দ্রুত শেষ করা হয়, সে জন্য তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান।

বরকত উল্লাহ আরও বলেন, দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে পড়তে যাওয়া ছেলেকে এভাবে নির্মম হত্যার শিকার হতে হবে, এমনটা তাঁরা কোনো দিন ভাবেননি।

ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনসহ নানা বিষয়ে অন্যায্য চুক্তি নিয়ে ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন আবরার। এর পরদিন রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়; সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, চলে মারধরও। নির্যাতনের একপর্যায়ে ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে তিনি মারা যান। পরদিন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় হলের সিঁড়ি থেকে।

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে পড়তেন আবরার। তাঁকে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ছাত্ররাজনীতি, আবাসিক হলে নির্যাতন ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব নিয়ে বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এ ঘটনায় আবরারের বাবা বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষ করে পুলিশ ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারকাজ চলে। এরপর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালত রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

পরে হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ দেওয়া রায়ে হাইকোর্টও ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন বহাল রাখেন।

কিন্তু এতেই মামলার ইতি ঘটেনি। কয়েকজন আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন। তাই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আবরারের পরিবারের ভাষ্য, সাজা ঘোষণা নয়, বিচারপ্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে শেষ হবে—এটিই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে আবরারদের বাড়িতে সাত বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি আজও টাটকা। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের ধাপ পার হয়ে মামলাটি এখন পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। গতকাল পিটিআই রোডের ওই বাসায় গিয়ে জানা গেল, আবরারের মা-বাবা ঢাকায় তাঁর ছোট ভাইয়ের কাছে রয়েছেন।

রায় ঘোষণা হয়েছে, সাজাও বহাল রয়েছে। তবু সাত বছর পেরিয়েও আবরারের পরিবারের অপেক্ষা ফুরোয়নি।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :