নবী-রসুলদের রেখে যাওয়া কাজ দাওয়াতে তাবলিগ

আপলোড সময় : ০৭-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৭-১০-২০২৬ ০৫:১২:৪২ অপরাহ্ন

দাওয়াতে তাবলিগের কাজ হলো পথ হারিয়ে ফেলা মানুষকে আবার আল্লাহর পথে নিয়ে আসা। কোনো ব্যক্তি কিংবা দলের কাজ এটি নয়; মহান আল্লাহ যে মহাপুরুষ নবী-রসুলদের পাঠিয়েছেন, এ কাজ তাঁদেরই। নবীজি (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও। বলা যায়, সে সময় থেকেই নবীওয়ালা এই কাজের জিম্মাদারি উম্মতের ওপর এসে পড়ে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত একদল মর্দে মুমিন দুনিয়ার যাবতীয় লোভ-লালসা ও আরাম-আয়েশ ছেড়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দাওয়াতে তাবলিগের মেহনত চালিয়ে যাচ্ছেন।

মানুষের জীবনে ইমান ও আমলের চেতনা জাগ্রত করাই এ মেহনতের প্রধান লক্ষ্য। দাওয়াতের মূল কথা হলো—মানুষ যেন নিজের সৃষ্টিকর্তাকে চিনে নেয়, তাঁর দেখানো পথে জীবন চালায় এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সঙ্গে সঙ্গে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্যও প্রস্তুত হয়। এ কারণে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশা বা এলাকার মানুষের মধ্যে এ মেহনত আটকে নেই। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে দীনের কথা পৌঁছানো।

দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত আসলে আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনেরও একটি উপায়। এতে অন্যকে দীনের কথা শোনানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইমান, আমল, আখলাক ও চরিত্র শুধরে নেওয়ার চেষ্টাও চলে। এ মেহনতের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে আছে নামাজ, ইলম ও জিকিরের প্রতি যত্নবান হওয়া, মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং রসুল (সা.)-এর সুন্নাহকে জীবনে ধারণের চেষ্টা করা। ব্যক্তি এভাবে বদলে গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারে, সমাজে এবং বৃহত্তর পরিসরেও। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও ভোগের প্রতিযোগিতায় ডুবে মানুষ যখন একটু একটু করে তার সৃষ্টিকর্তা ও আখিরাতকে ভুলতে বসে, দীনের এ মেহনত তখন তাকে আবার নিজের মূল পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেয়। দাওয়াতের কেন্দ্রীয় বার্তা এই উপলব্ধি যে সম্পদ, পদ-পদবি বা দুনিয়ার সাফল্যে নয়, মানুষের আসল সফলতা নিহিত আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। এ বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে মুমিনরা যুগের পর যুগ নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য ব্যয় করে চলেছেন।

নবীওয়ালা এই কাজের আনজাম যাঁরা দেবেন, তাঁদের মধ্যে এক আশ্চর্য শক্তি থাকা দরকার। ধৈর্যশক্তিই সেই শক্তি। সবর না থাকলে দাওয়াতের মেহনতে সফলতার কোনো সম্ভাবনা তো থাকেই না, বরং পদে পদে শয়তানের ওয়াসওয়াসার চোরাবালিতে আটকে গুনাহের গর্তে তলিয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। সুতরাং সবরের মতো কঠিন গুণ যাঁরা আয়ত্ত করতে পারেননি কিংবা পারবেন বলেও মনে হয় না, অন্তত সবরের ওপর অটল থাকার চর্চা যাঁদের নেই, দাওয়াতের এ কঠিন নবীওয়ালা কাজ তাঁদের জন্য কোনোভাবেই নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘ওয়ামা ইউলাক্কাহা ইল্লাল্লাজিনা সবারু, ওয়ামা ইউলাক্কাহা ইল্লা জুহাজ্জিল আজিম। অর্থ: দাওয়াতের কঠিন কাজের আনজাম তারাই দিতে পারে, যারা চরম ধৈর্যশীল। দাওয়াতের কাজে সফল তারাই হয়, যারা পরম সৌভাগ্যবান’ (সুরা হামিম সেজদাহ-৩৬)।

ধৈর্যের অর্থ যেমন অনেক, তার রূপও অনেক। যাঁরা দাওয়াতের কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে এটুকু ধৈর্য থাকা চাই যে কেউ গালি দিলে তাঁরা জবাব দেবেন হাসি দিয়ে; কেউ তাঁর পথ আটকালে তিনি তার জন্য পথ খুলে দেবেন; কেউ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে তিনি তার জন্য সেই ষড়যন্ত্রের জাল কেটে দেবেন; কেউ তাঁর ঘর ভেঙে দিলে, আশ্রয় কেড়ে নিলে দায়ি সেই ব্যক্তিকেই ঘর করে দেবেন, আশ্রয় খুঁজে দেবেন। এমন সুন্দর আচরণ কেবল কাফের-মুশরিকদের সঙ্গে দেখালেই চলবে না, নিজের সাথি ভাইদের সঙ্গে তা দেখাতে হবে আরও বেশি করে। নবীজি (সা.)-এর গোটা জীবন খুঁজে দেখলে আমরা এ রকমই পাই।

এই দাওয়াতি আচরণ নবীজি (সা.) কোথা থেকে শিখলেন? শিখেছেন তাঁর প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকেই। নবীর উম্মতও যেন তাঁর মতোই মহৎ চরিত্রের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে, সে জন্য বিশেষ করে নবীওয়ালা কাজের আনজাম যাঁরা দেবেন তাঁদের উদ্দেশে আল্লাহ বলছেন, ‘ইদফা বিল্লাতি হিয়া আহসান। ফাইজাল্লাজি বাইনাকা ওয়া বাইনাহু আদাওয়াতুন কাআন্নাহু ওয়ালিউন হামিম। তোমার সঙ্গে যারা মন্দ আচরণ করে তাদের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো আচরণটি কর। তাহলে দেখবে যে তোমার জানের দুশমন ছিল সে তোমার জানের দোস্ত হয়ে গেছে’ (সুরা হামিম সেজদাহ-৩৪)।

অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন, কোনো কাফের-মুশরিকের সঙ্গে তুমি সবচেয়ে ভালো আচরণ কর—এমন কথা এখানে বলা হয়নি; বলা হয়েছে, তোমার সঙ্গে যে ব্যক্তিই মন্দ আচরণ করুক, সে যে-ই হোক, তার সঙ্গে চরমতম ভালো আচরণ কর। তবেই সে হয়ে উঠবে তোমার সবচেয়ে কাছের হিতাকাঙ্ক্ষী-শুভাকাঙ্ক্ষী-বন্ধু।

লেখক: প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :