একসময় ৬৭৫ জন শিক্ষার্থী ছিল গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বর্তমানে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী নেমে এসেছে মাত্র ১৬০ জনে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাষ্য, শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন, পরিবহন ও খেলার মাঠের সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা না পাওয়ার বিষয়টি; ২০১৯ সালের পর থেকে তাঁরা তা পাচ্ছেন না।
২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির পাশে মনোরম পরিবেশে বিদ্যালয়টি চালু হয়। তখন নিয়োগ পান ১৬ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী। প্রথম বছরেই ৬৭৫ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তবে কলেজ শাখা চালু করা হয়নি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ২০২০ সালে বিদ্যালয়টিকে পাঠদানের অনুমোদন দেয়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়টি উপাচার্যের বাসভবনের পাশে স্থানান্তর করা হয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, স্থানান্তরের পর থেকেই বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকট বেড়ে চলেছে। বর্তমানে একটি কক্ষে একই সময়ে দুটি শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়, ফ্যানও পর্যাপ্ত নেই, বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে; আছে নিরাপদ খাবার পানি ও ওয়াশরুমের সমস্যাও। আশপাশে ঝোপঝাড় থাকায় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কেও থাকে।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া খানম জানায়, ‘আমি প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছি। আমাদের বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো ভালো নয়। ওয়াশরুম ও নিরাপদ খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। ভিসি স্যার আমাদের এ সমস্যার সমাধান করবেন বলে আমি প্রত্যাশা করছি।’
ফরিদুজ্জামান আহসাফ নামের আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘ওয়াশরুমের সঙ্গে ঝোপ-জঙ্গল। সেখানে সাপ থাকে। ভয় লাগে। এ ছাড়া বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষের চাল দিয়ে পানি পড়ে।’
রিয়ান নামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘খেলার মাঠ নেই। রোদে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যাই। খুব কষ্ট করে ক্লাস করি। তাই স্কুলের খেলার মাঠ ও নতুন ভবন চাই।’
অভিভাবকদের ভাষ্য, এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আন্তরিকভাবে পাঠদান করেন এবং শিশুদের যত্ন নেন। সে কারণেই অবকাঠামোগত নানা সমস্যা সত্ত্বেও সন্তানদের তাঁরা অন্য বিদ্যালয়ে সরিয়ে নেননি।
প্রাক-প্রাথমিকের তাইবুল্লাহ রোহান ও প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুল্লাহর মা তাসলিমা বেগমের ভাষ্য, ‘এখানে শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করেন। তাঁরা শিশুদের সুন্দরভাবে দেখভাল করেন। তাঁদের কারণেই দুই ছেলেকে এখান থেকে নিয়ে অন্য স্কুলে দিইনি।’
সায়লা জামান নামের আরেক অভিভাবক, যিনি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহিমের মা, বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চমৎকার ও নিরাপদ পরিবেশ শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সাহায্য করে। এ কারণে এখানে সন্তানকে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার তুলনায় সমস্যা অনেক বেশি। এক কক্ষে একই সঙ্গে দুটি ক্লাস নেওয়া হয়। ক্লাসে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যাও রয়েছে।’
মো. নাজমুল ইসলাম নাহিদ এ বিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আমি এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি। এখন গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে পড়ছি। স্যার-ম্যামরা বিদ্যালয়টিকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তাঁরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এটি খুব কষ্টের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটির সমাধান করবেন বলে আশা করছি।’
ঈমান আলী নামের আরেক সাবেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘আমাদের সময় বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব ভালো ছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বিদ্যালয়টি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এটি সমাধান করে বিদ্যালয়টিকে মডেল বিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে।’
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক নাদিম আহমেদ জানান, ‘২০১৯ সালে ভিসি চলে যাওয়ার পর আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে আছে। স্কুলটি লাইব্রেরির পাশ থেকে স্থানান্তর করে ভিসি স্যারের বাড়ির পাশে আনা হয়। তারপর থেকে সংকট বাড়তে থাকে। এখন শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। ভিসি স্যার স্কুলের সমস্যা দূর করলে এখানে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাবে।’
আরেক সহকারী শিক্ষক আফরোজা খানমের ভাষ্য, ‘কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে বিদ্যালয়টির সমস্যা সমাধানের জন্য ভিসি স্যারসহ শিক্ষাবান্ধব সরকারের কাছে জানাচ্ছি।’
নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে সহকারী শিক্ষক আলেয়া বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টাকা ও আমাদের পকেটের টাকা দিয়ে স্কুল চালিয়ে যাচ্ছি। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষক খুলনা, কোটালীপাড়াসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নিয়মিত স্কুল করেন। তাঁদের কষ্ট আরও বেশি। তাই সদ্য যোগদান করা ভিসি স্যার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন বলে দাবি জানাচ্ছি।’
অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের কাছ থেকে বিদ্যালয়টির অনুমোদন ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর ভাষ্য, ‘বিদ্যালয়টির কোনো অনুমোদন নেই। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামেও নেই। এখানে বিদ্যালয় হয়েছে, শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীও রয়েছে। তাই আমি কমিটি করে এটি অর্গানোগ্রামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করব। তারপর ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেব। স্কুলের ব্যাপারে যা যা করার, তা আমি করব। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা প্রসার, মেধা-মনন ও কল্যাণে আমি বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান করব।’