২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিমার্জনের পাশাপাশি নতুন বিষয়বস্তু যোগ করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন বইগুলোতে বিস্তারিতভাবে স্থান পাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এই উদ্যোগ নিয়েছে। এর অধীনে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে যুক্ত হচ্ছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক নতুন পাঠ্যসামগ্রী।
গণমাধ্যমের হাতে আসা এনসিটিবির এক নথি অনুযায়ী, বাংলা সাহিত্য, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা—এই বইগুলোতে সব মিলিয়ে ১৪টি সংযোজন ও পরিমার্জন আনা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০২৭ সালের পরিবর্তনগুলো মূলত বিদ্যমান বইয়ের সংযোজন ও পরিমার্জন। এতে খুব বেশি পরিবর্তন হচ্ছে না। বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে হলে তা ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে আসবে।’
এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, গতিপ্রকৃতি, আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ড, শহীদদের আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা এবং এই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম, হত্যা, অর্থ পাচার, নির্বাচনী ব্যবস্থা, পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক হত্যা ও গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো নবম-দশম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে তুলে ধরা হবে।
২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে যেসব পরিবর্তন আসছে
এনসিটিবির নথিতে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর মধ্যে রয়েছে জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ (আমরা বিদ্রোহ করলাম) এবং স্বাধীনতার ঘোষণা। বিষয়টি তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত আকারে এবং অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে বিশদভাবে পড়ানো হবে।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত হবে পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অধ্যায়ে। পাশাপাশি নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে জিয়াউর রহমানের রচনা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’।
মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট অন্য সংযোজনগুলোর মধ্যে আছে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য সাত বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ এবং অষ্টম শ্রেণির জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্স’ শীর্ষক অনুচ্ছেদ। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিলের ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া বৈঠকসহ মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামো জায়গা পাবে নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়েও বেশ কিছু নতুন পাঠ যোগ হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ওপরের শ্রেণিগুলোর বইয়ে ধাপে ধাপে বিশদভাবে তুলে ধরা হবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতা বিপ্লব’-এর ইতিহাস। একই সঙ্গে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে যুক্ত হবে ‘১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান’ শিরোনামের অধ্যায়।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে চতুর্থ শ্রেণির বইয়ে যুক্ত হচ্ছে ‘শহীদ আনাসের গল্প’, আর নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে থাকছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বিষয়ক তথ্য।
২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম ও নতুন বই
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাওলা গণমাধ্যমকে জানান, চলতি মাস থেকেই ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ শুরু করবে সংস্থাটির ‘কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিশন কোর কমিটি’। তিনি বলেন, শিক্ষাক্রম রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়, এটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে।
এর আগে ২০২৭ সালে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চালু হবে চারটি নতুন বই। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য থাকছে খেলাধুলা এবং ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বিষয়ক বই। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে ‘কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দের সাথে শেখা’ (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) নামে দুটি বই। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শিরোনামে একটি নতুন পাঠ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উদীয়মান প্রযুক্তি সম্পর্কিত তথ্য যোগ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির লক্ষ্যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং ও সাইবার সিকিউরিটির মতো আধুনিক বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত করে সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।