আ আওয়াজ ডেস্ক: ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। আন্দোলন ঠেকাতে মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ, অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল এবং মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আন্দোলনের নেতা ও ইউটিউব ব্যক্তিত্ব ধ্রুব রাঠিসহ প্রায় ২০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ‘ককরোচ জনতা পার্টি’সহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, নয়াদিল্লির প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ। এ সময় কয়েকজনকে আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের এক সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকা থেকে প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আন্দোলনের সমর্থক ও ইউটিউব ব্যক্তিত্ব ধ্রুব রাঠিও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক মুখপাত্র।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখার পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা-যাওয়ার কথা ছিল, এমন অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে বসানো হয়েছে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড। বিভিন্ন স্থানে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামসহ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিশেষ যানবাহনও মোতায়েন করা হয়েছে।
বিক্ষোভের আয়োজক ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ সরকারের কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। দিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে মুম্বাইয়ে সংবাদ সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, রেল ও মেট্রো পরিষেবা, ইন্টারনেট এবং সড়ক বন্ধ করার প্রয়োজন কেন হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ সরকারের ভয়েরই বহিঃপ্রকাশ।
আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা ছিল, শনিবার সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ জানানো। তবে শুক্রবার দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দেয়, বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আইন অমান্য করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় তারা।
পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক ও সতর্কতামূলক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে পুলিশের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁদের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা মৌলিক অধিকার।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক থেকেই এ আন্দোলনের সূত্রপাত। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই প্রশ্ন ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে কুমার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ভোটারের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারকে মৃত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কমিশনের দাবি, এগুলো খসড়া সংশোধনের পর্যায়ে চিহ্নিত ভোটারের হিসাব; যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ভুলবশত যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের পুনরায় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর দাবি, তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিজেপির বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই দলটির নির্বাচনী সাফল্যের প্রধান কারণ। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।