লিমন দেওয়ান, নারায়ণগঞ্জ: প্রথম দেখাতেই অপার বিস্ময়, ভালোলাগা, ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা ভালোবাসা থেকে একটি ‘কবিতার’ জন্ম, একটি কবিতা থেকে একটি ‘স্কুলের’ জন্ম, স্কুল থেকে চরের ‘নামকরণ’, চর রক্ষা করতে ‘চর-রক্ষা আন্দোলন’, আন্দোলন থেকে জাতীয় সংসদে একটি নতুন ‘আইনের’ জন্ম, সেই আন্দোলন থেকে একটি ‘কবিতা বইয়ের’ জন্ম। সংক্ষেপে স্বপ্ন-ছোঁয়ার গল্পটা অনেকটা এমনই।
চারদিকে নদী ঘেরা চর ‘নুনেরটেক’ ঘেষে মেঘনা নদীতে জেগে ওঠে নতুন একটি চর। নতুন জাগা ওই চরের তিনটি অংশ সবুজবাগ, গুচ্ছগ্রাম ও রঘুনারচর। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রজেক্ট করেছিল এখানে। যদিও পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে নতুন সরকার এসে ওই প্রজেক্ট বাতিল করে দিয়েছিল, তবুও গুচ্ছগ্রামের ওই পরিবারগুলো সেখানেই থেকে যায় এবং তাঁরা এখনো সেখানেই বাস করছেন।
২০০৬ সালের অক্টোবর মাস, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম চারদিকে মেঘনা নদী বেষ্টিত ছোট্ট এক চরে। তখনো তার নাম অজানা, তখন শরৎকাল, নীল আকাশের নিচে অজস্র কাশবনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস বইছে সু-শীতল বাতাস! মনোমুগ্ধকর ওই দৃশ্য দেখে সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে এসে ওই চর নিয়ে আমি ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলাম। পরবর্তীতে ওই কবিতাটি ২০১৫ সালে ঐতিহ্য প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত আমার তৃতীয় কবিতার বই “মায়াদ্বীপ”-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই শুরু থেকেই, ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে আমি ভালোবেসে এই চরকে নাম দিই ‘মায়াদ্বীপ’। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুরাও এই চরকে ‘মায়াদ্বীপ’ বলে ডাকতে শুরু করে।
নতুন জাগা সেই চরে কোনো স্কুল ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, নাগরিক কোনো সুযোগ-সুবিধাই ছিল না। অধিকাংশ মানুষ ছিল সুবিধাবঞ্চিত, অবহেলিত। বয়স্কদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল পাঁচ ভাগেরও নিচে। যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম, সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওই চরে শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করব। পরের বছর ২০০৭ সালে ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলাম সেই চরে। আমি নিজে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, সেই সুবাদে অনেক কবি-লেখক-সাংবাদিক বন্ধুরা সোনারগাঁ বেড়াতে আসেন। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে নাট্যকার ও কবি সাইমন জাকারিয়া এই চরে আসেন বেড়াতে এবং আমাদের ‘সুবর্ণগ্রাম’-এর কার্যক্রম দেখে এই নিয়ে পত্রিকায় লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট প্রথম আলো পত্রিকার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ছুটির দিনে’ ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’ নামে কাভার স্টোরি ছাপা হয়। বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া এই কভার স্টোরিটি লিখেছিলেন।
২০১০ সালের জুন মাসে যখন মায়াদ্বীপের খুব নিকটে চর ঘেষে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন শুরু হয়, তখন মায়াদ্বীপের মানুষ ও দ্বীপের অপার সৌন্দর্য্যকে রক্ষা করতে, এখানে বসবাসকারী মানুষদের জীবন-জীবিকা, ও পরিবেশ রক্ষার জন্য মায়াদ্বীপ-এর মানুষদের সঙ্ঘবদ্ধ করে আমি আন্দোলন শুরু করি।
এই আন্দোলনের নামকরণ করি ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’। এই আন্দোলনের সঙ্গে তখন সংহতি প্রকাশ করেন স্থানীয় জনগণ ছাড়াও সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার লেখক-কবি ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন অনেক মানুষজন। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমরা যুক্ত করি বিভিন্ন পেশাজীবির লোকজন ও পরিবেশবাদী সংগঠনকে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি আমরা অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম, এর মধ্যে কিছু ছিল এমন, প্রশাসনের বিভিন্ন লেভেলে এই ব্যাপারে জানানো, সোনারগাঁ উপজেলার ইউএনও, এসি-ল্যান্ড, নারায়ণগঞ্জ জেলার ডিসি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া, বালু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রেসক্লাবে এবং জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনকে বিষয়টা সম্পর্কে জানানো, যেমন- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), বেলা হংকং বেইজড মানবাধিকার সংগঠন ‘এশিয়া হিউম্যান রাইটস কমিশন’, জাতিসংঘসহ অনেক দেশি-বিদেশী প্রতিষ্ঠানে আমরা মাসের পর মাস ইমেইল করেছি। এর ফলশ্রুতিতে ২০১২ সালে জাতিসংঘএই চর নিয়ে ইন্টারভেন করে, বাংলাদেশ সরকারকে ৮ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে, সেই চিঠিতেও চরের নাম ‘মায়াদ্বীপ’ উল্লেখ করা ছিল। এমনকি এই চর রক্ষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসনের কাছে যত চিঠি এসেছিল তাতে ‘মায়াদ্বীপ’ নামটি উল্লেখ করা হয়েছিল। বাস্তবে সরকারি নথিতে ‘মায়াদ্বীপ’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব তখনো ছিল না, এখনো নেই। যদিও এই নামটি সরকারিভাবে রেকর্ডভুক্ত না, তবুও মায়াদ্বীপ আছে মানুষের হৃদয়ে, মানুষের মুখে মুখে। ভবিষ্যতে একদিন এই চরের নাম সরকারিভাবেও মায়াদ্বীপ হবে বলে আমরা আশা করছি।
নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সামছুর রহমান শুরুর দিকে চরবাসীর ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’-এর পক্ষে থাকলেও, পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের চাপে আর থাকতে পারেননি। সেই সময় যারা আন্দোলনের পক্ষে ছিল আমি সহ চরবাসীর অনেকের বিরুদ্ধে বালু সন্ত্রাসীরা একের পর এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা করেছিল। তখন আমি বাধ্য হয়ে ২০১১ সালে হাইকোর্টে মায়াদ্বীপ রক্ষায় জনস্বার্থে রিট করেছিলাম। ওই রিট পিটিশনের শুনানি শেষে ২৬/৪/২০১১ সালে বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ এবং বিচারপতি মো. শাখাওয়াত হোসাইন রুল জারি করেছিলেন এবং চরবাসীর পক্ষে সংশ্লিষ্ট বালু মহালে ‘স্টে অর্ডার’ দিয়েছিল। এতকিছুর পরও বালুকাটা (আসলে চরকাটা) পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিছুদিন বন্ধ থাকতো, আবার শুরু হতো। যদিও এইসব আলু উত্তোলন কোম্পানি নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিসি অফিস এবং কুমিল্লা জেলা ডিসি অফিস থেকে ইজারা নিয়ে থাকে, কিন্তু নদীর যে স্থানে ‘বালু মহাল’ ইজারা নেয়, সেখানে না কেটে তারা অধিক মুনাফার লোভে বালু কাটে চরঘেঁষে। যার ফলে চরবাসী তাঁদের বসতবাড়ি, জীবন-জীবিকা হারায়। সেই সময় আমাদের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করেছিল অবৈধ বালু সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে দুইটি মামলার ১ নম্বর আসামী ছিলাম আমি। মায়াদ্বীপবাসীদের অনেকেই হামলা, মিথ্যা মামলা ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন, জীবিকার জায়গা, যেমন-নদীতে মাছধরা বন্ধ করে দিয়েছিল অনেকবার। আমি নিজে তিনবার আক্রমণের শিকার হয়েছি। ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই বালু সন্ত্রাসীরা আমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিল মেঘনা নদীর মাঝখান থেকে, উদ্দেশ্য ছিল মেরে ফেলার। পরে সাংবাদিক বন্ধুদের তৎপরতায় ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আমাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিস্থিতি যখন খুব নাজুক ছিল তখন কিছু সময়ের জন্য আমি দেশছাড়া থাকতেও বাধ্য হয়েছিলাম।
মায়াদ্বীপের ভৌগলিক অবস্থান:
মায়াদ্বীপ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদী বেষ্টিত ছোট্ট একটি চর। এই চরে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসতি। এর পাশের চরের নাম নুনেরটেক, যেটা প্রায় ২০০ বছর প্রাচীন একটি চর, যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। নুনেরটেকে রয়েছে স্বনামধন্য একজন ইসলামিক স্কলার নুরুল ইসলাম লালপুরীর সমাধী (লালপুরি শাহ্? দরবার শরীফ)। মায়াদ্বীপের উত্তর দিকে নুনেরটেক, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মেঘনা নদীর বড় অংশ, নদীর ওইপাশে কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার রাম প্রসাদের চর।