মোঃ মজিবুর জুয়েল, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী: বর্ষার শেষের দিকে মাঠজুড়ে শুরু হয়েছে আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, উজানচর ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন জমি প্রস্তুত ও পেঁয়াজের চারা রোপণে। তবে আবাদ শুরুর এ সময়ে সময়মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা। কৃষকদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সার কম পাওয়ায় অনেক সময় অতিরিক্ত টাকা দিয়েও সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পেয়ে অনেক সময় রাতের আঁধারে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে আগাম পেঁয়াজ চাষে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পেঁয়াজ উৎপাদনের পর বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের আশঙ্কাও করছেন তারা।
গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা জমি প্রস্তুত করছেন। কেউ জমিতে সার প্রয়োগ করছেন, আবার কেউ মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের চারা রোপণে ব্যস্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে চলছে কৃষকের কর্মযজ্ঞ।
দৌলতদিয়া এলাকার কৃষক সাহিদুল খান বলেন, সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত টাকা দিলে রাতের আঁধারে সার পাওয়া যায়। কৃষকের মজুরিও অনেক বেশি। এর সঙ্গে সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ সার না পাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি।
তিনি বলেন, পেঁয়াজ আবাদে সময়মতো সার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে সার দিতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
আরেক কৃষক কালাম শেখ বলেন, আমরা কৃষি কার্ড চাই না, সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার ও কীটনাশক চাই। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম চাই। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, বীজ, সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারে সঠিক দাম না পেলে কৃষককেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
গোয়ালন্দ বাজারের বিসিআইসি ডিলার খন্দকার ফারুক হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সার সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ মাসে আমার চাহিদা ছিল ১০ হাজার বস্তা সার। কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ৯০০ বস্তা।
তার দাবি, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরবরাহের ক্ষেত্রে চাপ কমবে। বর্তমানে বরাদ্দ কম থাকায় অনেক কৃষককে চাহিদামতো সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে কৃষকদের সার সংকটের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার। তিনি বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে। তবে কৃষকরা অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে সার ব্যবহার করায় সাময়িকভাবে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, গোয়ালন্দ উপজেলায় এবার ১ হাজার ৫৯ হেক্টর জমিতে মুড়িকাঁটা পেঁয়াজ আবাদ হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আবাদ চলছে। আশা করছি, এবারও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, কৃষকদের সারের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার না করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সার প্রয়োগ করলে অপচয় কমবে এবং সারের ওপর চাপও কমবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, উজানচর ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাম মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় আগাম পেঁয়াজ বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কৃষকদের মধ্যে এ আবাদে আগ্রহও বেশি।
তবে কৃষকদের ভাষ্য, শুধু আবাদ বাড়ালেই হবে না, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়তে থাকলে পেঁয়াজের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে আগাম পেঁয়াজ চাষ করে কৃষক লাভের বদলে লোকসানের মুখে পড়তে পারেন।
এদিকে মাঠে আগাম মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হলেও সার নিয়ে কৃষক ও ডিলারের অভিযোগের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভিন্ন চিত্র। ডিলারের দাবি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ খুবই কম। অন্যদিকে কৃষি বিভাগের দাবি, পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কোথায় সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছাতে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে। তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, সার সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে। একই সঙ্গে পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।
কারণ, মাঠে কৃষকের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে বাড়তি উৎপাদন খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত কৃষকের কাঁধেই থেকে যাবে। আর সারের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে এখনই যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা সমাধান করা না গেলে আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।