দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস

আপলোড সময় : ১৬-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ১৬-১০-২০২৬ ০৯:০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন

দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সার্বজনীন উৎসব। দুর্গাপূজা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ভূমিকা পালন করে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস তৈরি করে।

দুর্গাপূজা এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সর্বজনীন এবং জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও ঐক্যের বন্ধন তৈরি করে।

দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল চালিকাশক্তি। প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজার অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়। এটি উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে প্রান্তিক মেহনতি মানুষ, সবার পকেটেই অর্থের জোগান দেয়।

ঈদের মতো দুর্গাপূজাতেও নতুন পোশাক এবং জুতো কেনার ধুম পড়ে। পূজা উপলক্ষে নতুন পোশাক, শাড়ি ও প্রসাধনীর কেনাকাটা বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড থেকে শুরু করে নিউ মার্কেট কিংবা ফুটপাতের দোকানগুলোতে এই সময়ে বিক্রি বৃদ্ধি পায়। পূজার সাজগোজের জন্য সোনা, ইমিটেশন জুয়েলারি এবং প্রসাধন সামগ্রীর বাজারে ব্যাপক কেনাকাটা চলে। ঢাকার শাঁখারীবাজারের মতো ঐতিহ্যবাহী পাইকারি ও খুচরা মার্কেটগুলোতে শাঁখা, সিঁদুর, প্রতিমার মুকুট ও শাড়ির কোটি টাকার ব্যবসা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ও পূজার সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা হয়।

প্রতিমা তৈরির সাথে যুক্ত ভাষ্কর ও কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদের বছরের আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই উৎসব থেকে। প্রতিমাশিল্পীরা মাটি, খড় ও রঙের কাজ করে প্রতিমা তৈরি করেন এবং এর মাধ্যমে লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন।

বিশাল সব মণ্ডপ, প্যান্ডেল নির্মাণ, ডেকোরেশন এবং চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, যা হাজার হাজার শ্রমিকের সাময়িক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম ও সাজসজ্জার কাজে যুক্ত কারিগর ও ব্যবসায়ীরা এই সময়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ পান।

রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং বিভিন্ন খাদ্য বিক্রেতাদের বিক্রি এই সময়ে বেশ বৃদ্ধি পায়।মণ্ডপের আশেপাশে বসা মেলা, ফুচকা বিক্রেতা, খেলনা বিক্রেতা এবং স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য এই ৫ থেকে ১০ দিন হলো পুরো বছরের সেরা আয়ের মৌসুম।

ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা ও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের কারণে পরিবহন খাত এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। পূজার ছুটিতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনে বড় ধরনের গতি আসে। বাস, ট্রেন এবং এয়ারলাইন্সের টিকিট বুকিংয়ের হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পূজার দিনগুলোতে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে বাইরে খাওয়া-দাওয়ার চল রয়েছে। ফলে রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানগুলোতে বিক্রি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, দুর্গাপূজা শুধু আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই উৎসব জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে একত্র করে এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি তৈরি করে।

দুর্গাপূজার সঙ্গে মিশে আছে শত বছরের বাঙালির ঐতিহ্য। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলা এই উৎসবের ঢাকের আওয়াজ, আরতি আর আনন্দময় পরিবেশ সব ধর্মের মানুষকে আকর্ষণ করে। এটি শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বরং একতা ও মিলনের এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম। নতুন পোশাকে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে খাওয়া-দাওয়া এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে এটি একটি সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। সার্বিক বিবেচনায় দুর্গাপূজা এখন আর শুধু একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়, এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক সামাজিক মেলবন্ধন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করে।

বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ এই উৎসবটি কেবল ধর্মীয় রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে রূপ নিয়েছে। ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমে দুর্গাপূজা আজ তার ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালি আত্মপরিচয় ও সর্বজনীন উৎসবের এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :