মাঠে মাঠে বাতাসে দোল খাচ্ছে সোনালী ধানের শীষ। দিগন্তজোড়া রোপা আমনের সৌন্দর্য জানান দিচ্ছে বাম্পার ফলনের কথা। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। তবে ফসলের মাঠে সমৃদ্ধির আবহ তৈরি হলেও স্বস্তিতে নেই স্থানীয় কৃষকরা। উৎপাদন খরচের চড়া মূল্য আর বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কায় বাম্পার ফলনের আনন্দের মাঝেও তাদের চোখে-মুখে এখন দুশ্চিন্তার কালো ছায়া।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে খোকসায় আমন ধান আবাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬,৭৪০ হেক্টর জমি। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় অর্জিত আবাদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬,৮৮৩ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪৩ হেক্টর বেশি।
উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে উপজেলা কৃষি অফিসের প্রণোদনা। উপজেলার ১,০০০ কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে উন্নত জাতের হাইব্রিড ধান বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। কৃষক আবারকৃত ধানের জাতের বিবরণ উফশী জাতের চাষাবাদ: বিআর ১১, বিআর ৩৩, বিআর ৩৯, ব্রি ধান ৪৯, ব্রি ধান ৫১, ব্রি ধান ৫২, ব্রি ধান ৭৫, ব্রি ধান ৮৭ এবং ব্রি ধান ১০৩ জাতসহ মোট ৪,২২১ হেক্টর জমিতে উফশী জাতের ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি ধান ১০৩ জাতের আবাদ সর্বোচ্চ ১২৮৫ হেক্টর জমিতে হয়েছে। এছাড়া বিনা ধান-৭, ১৭ ও ২৬ জাতের ধানও রোপণ করা হয়।
* স্থানীয় ও অন্যান্য জাত: ধানী গোল্ড, এ আর জেড-৭০০৩, গোল্ডেন-১, লালগোড়া, পাইজাম, স্বর্ণাসহ মোট ২,৬৫০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় ও অন্যান্য জাতের চাষাবাদ করা হয়েছে।
* হাইব্রিড ও সুগন্ধি জাত: হাইব্রিড ও সুগন্ধি জাতের ধান রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১২ হেক্টর জমিতে।
ফলন বাম্পার, তবে খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা কৃষকরা ইতোমধ্যেই আগাম জাতের ধান কাটা ও মাড়াই শুরু করেছেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার এই আনন্দঘন মুহূর্তে তাদের ভাবিয়ে তুলছে আকাশছোঁয়া উৎপাদন খরচ। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচের তেল এবং শ্রমিক মজুরির অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিটি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ বেড়ে গেছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
শিমুলিয়া গ্রামের কৃষক মোবারক হোসেন জানান: “এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হবে। তবে ধান উৎপাদনে সার, বীজ, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ধানের ন্যায্য মূল্য পাব কিনা—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।”
পৌরসভার কৃষক হাসেন আলী ৪ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন: “কৃষি অফিস থেকে উন্নত জাতের ধান বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষ করেছিলাম। কিন্তু উৎপাদন খরচ এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ধানের মূল্য বৃদ্ধি না করলে আমাদের খরচের পয়সাও ঘরে আসবে না। এ বছর সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের দাম বৃদ্ধি করে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান সংগ্রহ করলেই তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকরা উপকৃত হবে।”
বাজার মনিটরিং ও সরকারি ক্রয়ের দাবি স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল মনে করছেন, ধান কাটার পর বাজারে যদি প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া যায়, তবে কৃষকরা দেনার দায়ে পড়বেন। সরকার যদি দ্রুত ধান ক্রয়ের সঠিক পরিকাঠামো তৈরি করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান সংগ্রহ করে, তবেই কৃষকের কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন হবে এবং তাদের মুখে আসল হাসি ফুটবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল রহমান জানান: “খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনে বরাবরই কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা সফলতা দেখিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সময়মতো সরকারি প্রণোদনার বীজ ও সার কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করি কৃষি বিপণনের সঠিক তদারকি করলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং সরকারি খাদ্য গুদামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অধিক পরিমাণ ধান-চাল সংগৃহীত হবে।”
কৃষকের ঘামঝরা পরিশ্রমে দেশ খাদ্যনিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, উৎপাদন খরচের সঙ্গে ধানের বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকলে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। খোকসার কৃষকরা এখন প্রত্যাশা করছেন—সরকার যেন সিন্ডিকেট রোধ করে সরাসরি কৃষকের হাত থেকে ধান কেনার উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যাতে বাম্পার ফলনের প্রকৃত সুফল তারা ঘরে তুলতে পারেন।