প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে কক্সবাজার সৈকতে জনসমুদ্র

আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৬ ০২:৫৭:০৪ অপরাহ্ন

উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে একে একে বিসর্জন দেওয়া হলো দুর্গাপ্রতিমা। বিদায়বেলায় ভক্তদের চোখে অশ্রু, আর বালুচরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করলেন লাখো মানুষ। বুধবার বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় জনসমুদ্র।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ ধর্মীয় আয়োজন দেখতে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক পর্যটকও। আয়োজকদের হিসাবে, বিসর্জন উৎসবে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

বিসর্জনের আগে বিকেল ৪টায় সৈকতের বিজয়ামঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ। জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

সমাবেশ শেষে লাবণী পয়েন্টে একে একে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন দেন ভক্তরা। বালুচরে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ এ দৃশ্য উপভোগ করেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে বিসর্জনস্থল পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলনমেলায়।

ঢাকার মালিবাগ থেকে আসা ফজলে আজিম বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিমা বিসর্জন দেখার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু কক্সবাজারের মতো এত মানুষের সমাগম কোথাও দেখেননি। হিন্দুদের বিসর্জন অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের উপস্থিতি তাঁকে অবাক করেছে।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু জানান, এবার কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে। বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার কক্সবাজার সৈকতে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এ উৎসব দেখতে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।

এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। সাগরের নীল জলরাশি ও ঢেউয়ের টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশা, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনের ছুটিতে কক্সবাজারে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এ সময়ে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ঘটনার পর কক্সবাজারে পর্যটকের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও হোটেলমালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেই শঙ্কা কাটিয়ে পর্যটকের ভিড় বাড়ছে।

হোটেলমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার টানা তিন দিনের ছুটিতে অন্তত তিন লাখ পর্যটক সৈকত ভ্রমণ করেছেন। রোববার থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের পূজার ছুটি। এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি এবং ২৫ অক্টোবর লক্ষ্ণীপূজার ছুটি মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে টানা ১০ দিনের ছুটি চলছে। এ সময়ে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ২১ অক্টোবর বিকেলে লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উৎসবের আগে-পরে তিন দিনে অন্তত চার লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। সব মিলিয়ে ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক আসবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।

তিনি জানান, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলে প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ এবং মাঝারি আকারের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলোও এক-দুই দিনের মধ্যে বুকিং হয়ে যেতে পারে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসন তদারকি করছে। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে একসঙ্গে ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

বুধবার সকালে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন পর্যটকেরা। কেউ সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউ ছবি তুলে ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখছেন। অনেকে ঘোড়া, বিচবাইক ও জেটস্কিতে চড়ার পাশাপাশি সাগরে গোসল করছেন। কেউ আবার বালুচরে ছাতা-চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার ব্যবসায়ী রাসেল চৌধুরীর সঙ্গে। স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজার আসেন তিনি। কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠার পর সকালে সুগন্ধা সৈকতে যান। সেখানে মানুষের ভিড় দেখে পরিবার নিয়ে চলে আসেন লাবণী পয়েন্টে। ৪০ বছর বয়সী রাসেল বলেন, লাবণী পয়েন্টেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখেছেন। পাশের চেয়ারে বসা গাজীপুরের বাসিন্দা হাবিব উল্লাহ বলেন, স্ত্রীর চাকরি ও নিজের ব্যবসার কারণে তাঁদের কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার পাঁচ দিনের জন্য কক্সবাজারে এসেছেন। ২১ অক্টোবর সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন দেখার পরদিন ২২ অক্টোবর বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

তারকা মানের হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব জানান, তাঁদের হোটেলের ৮৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অতিথিদের চাপ থাকবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হলে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :