রাজস্ব ছাড় দিলেও স্বস্তি নেই বাজারে

আপলোড সময় : ২৫-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০৯:০৩:২১ অপরাহ্ন

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম ও পরিবেশবান্ধব গাড়িসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক-করছাড় দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি ব্যয় কমিয়ে সাধারণ ভোক্তার জন্য পণ্যের দাম সহনীয় রাখা এবং বাজার স্থিতিশীল করাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে বাজেট ঘোষণার চার মাস পরও এসব সুবিধার প্রভাব বাজারে কতটা পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় ১৮টি পণ্য ও পণ্যশ্রেণিতে শুল্ক-করছাড়ের সুফল ভোক্তারা পেয়েছেন কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছে এনবিআর।

এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়েছে, শুল্কের হার কমানো বা পরিবর্তনের ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারদর কতটা কমেছে এবং ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছেছে কি না, তা বাজেট বিশ্লেষণের জন্য জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পণ্যে শুল্কের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে, সেগুলোর আমদানি ব্যয়, বিক্রয়মূল্য ও খুচরা বাজারের দামের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে হবে।

শুল্ক-করছাড়ের আওতায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক ও প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি, বস্ত্র এবং বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহন।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুল্ক-কর কমানোর ফলে সরকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পাননি। বরং আমদানিকারকেরা লাভবান হয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু শুল্ক কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; এ জন্য প্রয়োজন কঠোর তদারকি।

এবারের বাজেটে খেজুর ও ৪৫ ধরনের মসলায় নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মসলার দাম প্রায় আগের মতোই রয়েছে। কিছু পণ্যের দাম বরং বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের খেজুর ও ফল ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ জানান, গত দুই সপ্তাহে পাইকারি বাজারে খেজুরের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। একই বাজারের তুহিন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রায়হানের ভাষ্য, মসলার দামও কিছুটা বেড়েছে। শুল্ক কমানোর সুবিধা ছোট ব্যবসায়ী কিংবা ভোক্তারা পাচ্ছেন না; এর সুফল মূলত আমদানিকারকদের কাছেই থেকে যাচ্ছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানের খেজুরের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ এবং আমদানি করা রসুনের দাম ২১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে আদার দাম ৫ শতাংশ, লবঙ্গের ৪ শতাংশ ও তেজপাতার ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে জিরার দাম ১১ শতাংশ এবং এলাচের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।

ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ক্ষেত্রেও শুল্ক-করছাড় দেওয়া হয়েছে। বাজেটে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওষুধশিল্পের ১৭টি নতুন কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নয়টি কাঁচামালকে সব ধরনের শুল্ক-কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সক্রিয় ওষুধের উপাদান বা এপিআই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫৩টি নতুন কাঁচামালে শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেটের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।

তবে কয়েকটি ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ ওষুধ আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একটি ফার্মেসির মালিক জানান, উৎপাদন খরচ বাড়ার কথা বলে কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি সরবরাহ কমিয়েছে। কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দাম বাড়িয়ে এসব ওষুধ নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ছাড় দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ, নোটবুক, ডেস্কটপ কম্পিউটার, প্রিন্টার, মনিটর ও সার্ভারের শুল্ক ও মূসক শূন্য করা হয়েছে। তবে এসব পণ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আগাম কর ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল রয়েছে। পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার বা চার্জিং স্টেশনের শুল্ক ১০ শতাংশ ও আগাম কর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য করা হয়েছে। ফ্ল্যাশ মেমোরি কার্ডসহ রেকর্ডবিহীন এ ধরনের মিডিয়ার শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ির বিভিন্ন শ্রেণিতেও শুল্ক কমানো হয়েছে। এক হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত পেট্রোল ইঞ্জিনের প্লাগইন হাইব্রিড গাড়িতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩ শতাংশ থেকে শূন্য এবং সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার সিসি পর্যন্ত পেট্রোল ইঞ্জিনের গাড়িতে সম্পূরক শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়িতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে শূন্য করা হয়েছে। ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে এ শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে শুল্ক-করছাড় দেওয়া হলেও তার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে কতটা পৌঁছেছে, তা এখন এনবিআরের পর্যালোচনার বিষয়। সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ব্যয় ও বাজারদরের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে করছাড়ের বাস্তব প্রভাব নিরূপণ করা হবে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :