যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের পাঠকের হাতে লেখক স্যালি রুনির উপন্যাস তুলে দিতে এগিয়ে এসেছে আয়ারল্যান্ডের বইয়ের দোকানগুলো। ফিলিস্তিনপন্থী একটি সংগঠনের প্রতি রুনির সমর্থনের জেরে প্রকাশনা সংস্থা ফ্যাবার যুক্তরাজ্যে তাঁর বই সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর দিয়েছে।
ফ্যাবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বই বিক্রির আয় ফিলিস্তিন অ্যাকশন নামের একটি সংগঠনকে দান করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন রুনি। সংগঠনটি ব্রিটেনে নিষিদ্ধ হওয়ায় সেই অর্থ লেখকের কাছে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, আর এ কারণেই যুক্তরাজ্যে তাঁর বইয়ের বিতরণ চালু রাখা যাচ্ছে না।
তবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের লন্ডনডেরির লিটল অ্যাকর্নস বুকস্টোরের মালিক জেনি ডোহার্টি থেমে নেই। আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে রুনির বই এনে তিনি বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন।
রুনির ‘নরমাল পিপল’, ‘ইন্টারমেজো’ ও ‘বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড, হোয়ার আর ইউ’সহ নানা উপন্যাসের পাশে দাঁড়িয়ে ৫৫ বছর বয়সী ডোহার্টি এএফপিকে বলেন, ‘বইগুলো বিক্রির ওপর আমাদের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আমরা এখনো বইগুলো সংগ্রহ করতে পারছি।’
উত্তর আয়ারল্যান্ডের অংশ হিসেবে লন্ডনডেরি যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত, তবে শহরটির অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত ঘেঁষে। এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে আয়ারল্যান্ডের পরিবেশকদের কাছ থেকে বই এনে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের নানা দেশের ক্রেতাদের কাছে পাঠাতে পারছেন ডোহার্টি।
গত অক্টোবরের মাঝামাঝি সিদ্ধান্তটি জানানোর সময় ফ্যাবার বলেছিল, ‘কোনো লেখকের বই বিক্রি করে সেই অর্থ তাকে দিতে না পারা প্রকাশকের জন্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি।’
প্রকাশনা সংস্থাটি জানায়, রুনির সঙ্গে সমঝোতা করেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের আওতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার। তবে রুনি যেখানে থাকেন, সেই আয়ারল্যান্ডে সংগঠনটি নিষিদ্ধ নয়।
যুক্তরাজ্যের নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকায় লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের সঙ্গে ফিলিস্তিন অ্যাকশনও রয়েছে। তাই দেশটিতে এই সংগঠনের সদস্য হওয়া, একে সমর্থন দেওয়া বা অর্থ জোগানো বেআইনি।
ফ্যাবার জানিয়েছে, রুনির প্রকাশক হিসেবে তারা এখনো দায়িত্ব পালন করছে এবং যুক্তরাজ্যের বাইরে তাঁর বইয়ের বিক্রি চালু রাখবে।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, রুনির বই নিষিদ্ধ হয়নি। যুক্তরাজ্যের দোকানগুলোতে আগে থেকেই থাকা বই বিক্রিতেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। শুধু ফ্যাবারের স্বাভাবিক যুক্তরাজ্যভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা দিয়ে নতুন বই আনা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় ডোহার্টির দোকানে নতুন ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে।
তাঁর কথায়, ‘এমন অনেক নতুন ক্রেতা এসেছেন, যারা আগে কখনো আমাদের দোকানে আসেননি।’ ডোহার্টি মনে করেন, এ বিতর্ক রুনির বইকে আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে।
আগে বইগুলো দোকানের সাধারণ তাকে বর্ণানুক্রমে রাখা থাকত। এখন সেগুলো সামনের কাউন্টারে বিশেষভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে, যাতে ক্রেতাদের চোখে পড়ে। ডোহার্টি জানান, এর ফলে বই নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে খোলামেলা ও ব্যক্তিগত আলাপও হচ্ছে।
ব্রিটেনের অন্য বই বিক্রেতারাও বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধানে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
ডোহার্টির ভাষায়, ‘আপনি চাইলে বইটি না-ও পড়তে পারেন। কিনতে না চাইলে সেটিও আপনার সিদ্ধান্ত।’
রুনির উপন্যাসের চাহিদা বেড়েছে আয়ারল্যান্ডের অন্য দোকানগুলোতেও। গলওয়ের কেনিস বুকশপ জানিয়েছে, ফ্যাবারের সিদ্ধান্তের পর সেখানে তাঁর বইয়ের বিক্রি আগের চেয়ে ১০ গুণ বেড়েছে।
ডোহার্টি বলেন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন আর উত্তর আয়ারল্যান্ডের কয়েক দশকের সংঘাতের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শহরটিতে এ বিতর্ক বিশেষ আলোড়ন তুলেছে।
এ ঘটনায় আয়ারল্যান্ডে সাহিত্যের ওপর সেন্সরশিপের ইতিহাসও তাঁর মনে পড়েছে। অতীতে এডনা ও’ব্রায়েন, স্যামুয়েল বেকেট ও জন ম্যাকগাহার্নের মতো খ্যাতিমান লেখকেরাও এমন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিলেন।
তাঁর মন্তব্য, ‘মনে হচ্ছে, আমরা সামনে এগোনোর পরিবর্তে আবার পেছনের দিকে ফিরে যাচ্ছি।’
তবে ডোহার্টির ধারণা, কোনো বইয়ে নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ এলে পাঠকের মধ্যে সেটি পড়ার আগ্রহ বরং আরও বাড়তে পারে। এতে স্যালি রুনিসহ অন্য আইরিশ লেখকদের বইও নতুন পাঠক পেতে পারে।
তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘নিষিদ্ধ বইই বেশি বিক্রি হয়। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বইটির প্রতি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের আগ্রহ তৈরি করে।’
এদিকে ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি। বুধবার ও বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্টে এ বিষয়ে আপিল শুনানির কথা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে স্যালি রুনির উপন্যাস বিক্রি হয়েছে কয়েক মিলিয়ন কপি। আধুনিক সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরায় তাঁর বইয়ের একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।
তাঁর উপন্যাস ‘নরমাল পিপল’-এর টেলিভিশন রূপান্তর বিবিসিতে প্রচারিত হওয়ার পর তিনি আরও বেশি পরিচিতি পান।
রুনি সম্পর্কে লন্ডনের বার্ড বুকসের মালিক ভিকি শেনকিন কের বলেন, ‘তিনি বর্তমান সময়ের অনুভূতি ও বাস্তবতাকে যেভাবে তুলে ধরেন, তা সত্যিই অনন্য। মানুষ তার বই ও লেখাকে ভালোবাসে।’
ফ্যাবারের সিদ্ধান্তের পর তাঁর দোকানেও রুনির বই বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়; দোকানে থাকা বাকি বইগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করে নতুন মজুত না গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।