সোলার এক্সপোতে প্রধানমন্ত্রী: কুইক রেন্টালের লুটপাট নয়, সাশ্রয়ী পথেই মিলবে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান

আপলোড সময় : ০৩-১১-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৩-১১-২০২৬ ০৫:৪১:৩৩ অপরাহ্ন

বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট করে নয়, বরং সাশ্রয়ী পথে অবশ্যই সম্ভব—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সচেতন উল্লেখ করে তিনি জানান, এ দুই খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধন হয় আজ সকালে, রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবারই প্রথম যৌথভাবে এই সোলার এক্সপোর আয়োজন করেছে। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।

বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার এখন একসঙ্গে কয়েকটি কাজ এগিয়ে নিচ্ছে—চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তিগুলো পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ।

এরই অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে ঠিক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এই লক্ষ্য পূরণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যেক মানুষেরই যুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

উদ্যোক্তাদের এ উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি আখ্যা দিয়ে তারেক রহমান জানান, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে, আর পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া হবে। শুধু টাকার অভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যাতে পিছিয়ে না পড়েন, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন কেবল একটি সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতা।

জ্ঞানের প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখার আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ কয়েকটি বিষয়ে নিজেদের ইনোভেটিভ আইডিয়া তুলে ধরে আজ কয়েকজন পুরস্কার পেয়েছেন। আগামীর বাংলাদেশে এভাবেই জ্ঞান আর নিত্যনতুন উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা চলুক—এমন প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, একটি ইনোভেটিভ আইডিয়া বাংলাদেশের জন্য গেইম চেঞ্জিং হতে পারে।

তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া যেন অর্থের অভাবে হারিয়ে না যায়, সে জন্য চলতি বাজেটে ‘স্টার্ট আপ’-এর জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

দেশকে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বাংলাদেশকে সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। পরিস্থিতি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।

চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সমপরিমাণ বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিজেলের মজুদ বাড়ানো হয়েছে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এরই মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় নষ্ট না করে আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কীভাবে মেটানো যায় এবং বাসাবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—সেটিই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নানা নীতি সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী সব এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে পারবে সরকার, ইনশাআল্লাহ।

সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগবে—এমনটাই সরকারের প্রত্যাশা বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় বসানো সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজেদের ব্যবহারের পর যাঁরা বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিতে পারবেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে তাঁদের কাছ থেকে সেই বিদ্যুৎ কিনবে সরকার—জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী জানান, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে এরই মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর কাজ এগোচ্ছে। তিনি নিজেও বাসায় সোলার প্যানেল বসিয়েছেন এবং ব্যবহারের পর বাড়তি কিছু ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে পেরেছেন।

তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি এর যন্ত্রপাতির দামও কমানো হচ্ছে, আর জনগণের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুতের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।

এ খাতের সার্ভিস প্রোভাইডারদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ—সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর পর তা ঠিকমতো চলছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে যেন তাঁরা নজর রাখেন। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার এবং তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রতি আন্তরিক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

কৃষিতেও সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান জানান, সেচের জন্য কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ দেয় সরকার। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোকে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতেরও সাশ্রয় হবে।

জনগণের চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়, আর বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্ব—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস উপভোগ করতে এবং বাসা, অফিস বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাল্ব, ফ্যান কিংবা নানা ধরনের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বন্ধ রাখতে।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, কেবল বড় প্রকল্প নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ তাঁদের রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও এ খাতে সহজে বিনিয়োগের সুযোগ আছে বলে জানান তিনি।

সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ‘স্ফুরণ: টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী, পরে তাঁদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। তার আগে সোলার সিস্টেম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয়।

মঞ্চে আরও ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :