ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশের বেশি, পোশাকের বাইরে পাঁচ খাতে চাঙা রপ্তানি

আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাসায়নিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া এবং প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি যে হারে বেড়েছে, তা সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি এসব খাতের এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাকে ক্রমশ জোরালো করছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০৯ কোটি মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। এ সময় তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি বিকাশমান পাঁচটি অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত।

খাতওয়ারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি, ২৭ শতাংশ, বেড়েছে রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি। এরপর পাট ও পাটজাত পণ্যে ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিশেষায়িত বস্ত্রে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্যে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এই চিত্র তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প খাতগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। সেই সঙ্গে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদন, নতুন বাজারে প্রসার এবং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

শীর্ষে রাসায়নিক ও ওষুধশিল্প

প্রবৃদ্ধিতে সবার আগে রাসায়নিক পণ্য খাত। জুলাই-অক্টোবরে এ খাতের রপ্তানি আয় ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি।

এতে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশের ওষুধশিল্প। চার মাসে ওষুধ রপ্তানি থেকে এসেছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশে বাংলাদেশি ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গতি পাচ্ছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসসকে বলেন, রাসায়নিক পণ্য, বিশেষ করে ওষুধশিল্পের এ অগ্রগতি দেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ার প্রতিফলন। রপ্তানি বহুমুখীকরণে খাতটি ক্রমেই সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে বলেও জানান তিনি।

পাটপণ্যে বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও বেশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে এসেছে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।

প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল পণ্যের চাহিদা বিশ্ববাজারে বাড়ছে। এতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হয়েছে; বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা এ শিল্পের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হাসান আরিফ বলেন, বিশ্বজুড়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ায় খাতটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আফ্রিকার দেশগুলোসহ নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে অবস্থান আরও মজবুত করতে হবে বলে মত দেন তিনি।

কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসাও করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এতে দেশীয় শিল্পের জন্য কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত হবে, পাটের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং তৈরি পাটপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ আসবে।

ড. কামরুজ্জামান আরও বলেন, কাঁচা পাটের বদলে উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে জোর দেওয়া দরকার। এতে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় দুটোই বাড়বে, বিশ্ববাজারে দেশের পাটশিল্পের অবস্থানও আরও শক্ত হবে।

বিশেষায়িত বস্ত্রে বাড়ছে সম্ভাবনা

বিশেষায়িত বস্ত্র খাতও ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। জুলাই-অক্টোবরে এ খাতের রপ্তানি আয় ১৪ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।

প্রচলিত পোশাকের বাইরে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাপড়, প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত বিশেষ উপকরণসহ নানা পণ্য এ খাতের মধ্যে পড়ে। এসব পণ্যে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ আছে।

হাসান আরিফের ভাষ্য, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনের মধ্য দিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষায়িত বস্ত্র খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতেও রপ্তানির ইতিবাচক ধারা বজায় আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে খাতটি আয় করেছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি।

আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের উদ্যোগ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে জোর এবং বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বাড়ায় খাতটির রপ্তানি আয় বাড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় কাঁচামাল সহজলভ্য হওয়া এবং পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের সুযোগ থাকায় চামড়া খাত দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত রপ্তানি খাত।

হাসান আরিফ বলেন, পণ্যের মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনে মনোযোগ দিলে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের অংশে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত হবে।

প্রকৌশল পণ্যে বাড়ছে আয়

প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিও বাড়ছে। জুলাই-অক্টোবরে এ খাত থেকে এসেছে ২৪ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। সাইকেল, যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ, কলকারখানায় ব্যবহৃত নানা উপকরণ ও হালকা প্রকৌশল পণ্য এ খাতের আওতায় পড়ে।

প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উদ্ভাবন ও উচ্চমূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকায় সংশ্লিষ্টরা প্রকৌশল পণ্যকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে দেখছেন। হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রকৌশল পণ্য দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।

বহুমুখীকরণে অগ্রগতির ইঙ্গিত

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে উদীয়মান পাঁচটি খাতের প্রতিটিই সামগ্রিক রপ্তানির চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। রাসায়নিক পণ্যের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রায় পাঁচ গুণ, আর পাট ও পাটজাত পণ্যে তা চার গুণের বেশি।

বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্যেও প্রবৃদ্ধি উল্লেখ করার মতো। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক থেকে এলেও অন্য খাতগুলোর এই অগ্রগতি রপ্তানি আয়ের উৎস বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা জাগাচ্ছে।

হাসান আরিফ বলেন, সর্বশেষ রপ্তানি পরিসংখ্যান দেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এ ধারা ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা, নতুন বাজার খোঁজা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বহুমুখী শিল্পভিত্তি গড়ার কোনো বিকল্প নেই।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :