কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা চীন এখন এ খাতের শেয়ার সামলাতে উদ্যোগী: প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে সাম্প্রতিক বড় দরপতনের পর সেগুলোর দাম ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এ খাতে বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
চীনের আলোচিত স্টার্টআপ ইউনিট্রি গত আগস্টে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। মানুষের মতো হাঁটতে ও নাচতে পারে এমন হিউম্যানয়েড রোবট বানায় প্রতিষ্ঠানটি; এসব রোবট দিয়ে এআই গবেষকেরা যন্ত্রকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তালিকাভুক্তির পর সাংহাইয়ে ইউনিট্রির শেয়ারদর দ্রুত চড়ে যায়, কিন্তু প্রায় তিন মাসের মধ্যে সেই সর্বোচ্চ দর থেকে শেয়ারটির দাম কমেছে ৪০ শতাংশ।
মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত চীনা চিপ নির্মাতা মুর থ্রেডস ও মেটাএক্সের শেয়ারদরও গত ছয় মাসে কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
সাংহাইয়ের প্রযুক্তিনির্ভর স্টার৫০ সূচকের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারেও দেখা গেছে একই ধরনের দরপতন, যদিও একই সময়ে সূচকটি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
চীনের প্রযুক্তি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ওয়াল স্ট্রিটের অস্থিরতাও; বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক নেমে যায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এআই অবকাঠামো গড়তে বিপুল অর্থ ঢেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত মুনাফা তুলতে পারবে কি না, সে প্রশ্নে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতি সামলাতে উদ্যোগী হয়েছে চীন সরকার। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শেয়ার কেনায় উৎসাহ দিতে কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে বাজারে অর্থের জোগান বাড়ানোর কয়েকটি ব্যবস্থা ফের চালু করেছেন। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সহায়তাপুষ্ট বিনিয়োগ তহবিলগুলোর লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, মঙ্গলবার এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) নামে পরিচিত নয়টি বিনিয়োগ তহবিলে নিট ১২০ বিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ ১৮ বিলিয়ন ডলার ঢুকেছে। বাজার স্থিতিশীল করতে বেইজিং প্রায়ই এসব তহবিল কাজে লাগায়। এবার এই বিনিয়োগের বড় অংশই গেছে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে, আর অর্থপ্রবাহ পৌঁছেছে প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে।
অন্যদিকে চলতি সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, শেয়ারবাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।
সাক্সো মার্কেটসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানার মতে, ‘দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং হতাশাজনক মুনাফার কারণে চীনের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলো উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে।’ তবে তিনি এ-ও বলেন, ‘নতুন সরকারি সহায়তা, শেয়ারের তুলনামূলক কম মূল্য এবং বাজার পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের আবারও এমন একটি খাতের দিকে আকৃষ্ট করছে, যেটি বছরের বেশির ভাগ সময়ই সংকটের মধ্যে ছিল।’
সাংহাইভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কুনকুয়ানের অংশীদার আজিন জিন জানান, চীনের প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ এখনো আছে। তিনি বলেন, ‘বেইজিং ও সাংহাই—উভয় শহরেই প্রতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হচ্ছে। প্রতিটি সভায় উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এমনকি অনেককে বসার জায়গা না পেয়ে চলাচলের পথেও বসতে হচ্ছে।’
চীনের অন্যতম পরিচিত বিনিয়োগ বিশ্লেষক লি দাশিয়াওর ভাষ্য, ‘এই শিল্পের দ্রুত বিকাশের ধারা থামানো সম্ভব নয়।’ তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি খাতের প্রকৃত অগ্রগতি আর শেয়ারদরের ওঠানামাকে আলাদা করে দেখা দরকার। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘বাহ্যিক বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে চীনের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরপতনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এসব শেয়ারের দাম কমেছে।’