‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’—১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের স্মৃতিবিজড়িত এই স্লোগান আবারও উচ্চারিত হলো রাজধানীর নয়াপল্টনে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শনিবার বিএনপির আয়োজিত সার্বভৌমত্ব র্যালিতে কয়েকজন প্রবীণের কণ্ঠে শোনা যায় সেই সময়ের স্লোগান। তাঁদের একজন ৭৪ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির। ৫১ বছর আগের ঘটনাপ্রবাহের স্মৃতি বুকে নিয়ে এবারও র্যালিতে যোগ দিয়েছেন তিনি।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত র্যালিতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান র্যালির উদ্বোধন করেন। পুরো আয়োজনজুড়ে দলীয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগানে মুখর ছিল রাজপথ।
এর মধ্যেই নয়াপল্টনের জোনাকি সিনেমা হলের সামনে কয়েকজন প্রবীণের স্লোগান নজর কাড়ে। তাঁরা বলছিলেন, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই’ এবং ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। তাঁদের মধ্যে স্লোগান ধরছিলেন হুমায়ুন কবির। বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৪ বছর। তিনি জানান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষণা, সেক্টর কমান্ডার ও সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা শুনে ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল।
হুমায়ুন কবির বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিশেষ করে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে সিপাহি বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীতে নানা আলোচনা চলছিল। তখন তিনি শাহবাগে থাকতেন। ৭ নভেম্বর বিদ্রোহী সৈনিকেরা তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনিও রাজপথে নেমে আসেন।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, শাহবাগের অনেক সহপাঠীকে নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। সৈনিকদের সঙ্গে ট্যাংকের ওপর উঠে স্লোগানও দিয়েছিলেন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, সেদিনের সেই দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব। নতুন প্রজন্মের কাছে ওই সময়ের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়। ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সেনানিবাস। বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসেন। একপর্যায়ে বিদ্রোহী সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। ওই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সামরিক অভ্যুত্থানের অবসান ঘটে।
জিয়াউর রহমান মুক্ত হওয়ার পর ৮ নভেম্বর থেকে সেনানিবাসে সৈনিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে শুরু করেন। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন সমাবেশে সৈনিকদের অস্ত্র জমা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দেন।
হুমায়ুন কবির জানান, সেদিন তাঁর সঙ্গে মিছিলে অংশ নেওয়া অনেক সহপাঠী এখন আর বেঁচে নেই। তাঁদের মধ্যে রহিম উদ্দিন ও শরিফ মিয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এবার শাহবাগ এলাকার কয়েকজন বিএনপি সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে দিবসটি পালনে এসেছেন। তাঁর ভাষ্য, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবার বিএনপি গুরুত্বসহকারে পালন করবে—এ খবর জেনেই বয়সের ভার উপেক্ষা করে ইতিহাসের স্মৃতি ও শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে র্যালিতে যোগ দিয়েছেন তিনি।