ভ্রমণকারীদের মধ্যে উন্নত ও বিলাসী সেবার চাহিদা বাড়ছে, আর তা মাথায় রেখে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ভবিষ্যতে মুনাফা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বিভিন্ন বিমান সংস্থা। এ লক্ষ্যে তারা বিলাসবহুল আসন যোগ করছে, মিশেলিন তারকাখচিত রেস্তোরাঁর শেফদের দিয়ে বিশেষ খাবারের মেন্যু সাজাচ্ছে, আর বিমানবন্দরে অভিজাত যাত্রীদের জন্য গড়ে তুলছে আধুনিক লাউঞ্জ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এমন কৌশলে নানা ফ্লাইটে সাধারণ তথা ইকোনমি শ্রেণির আসন আরও কমতে পারে। বিমান সংস্থাগুলো ধারণা করছে, সামনে প্রায় ৭০ শতাংশ যাত্রীই বাড়তি সুবিধার আসন কিংবা বিজনেস ও ফার্স্ট ক্লাসের মতো উন্নত সেবার দিকে ঝুঁকবেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে উড়োজাহাজের জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবু বিমান সংস্থাগুলোর বিশ্বাস, যাত্রীদের কাছে উন্নত সেবা বিক্রি করে দীর্ঘ মেয়াদে ভালো মুনাফা করা সম্ভব।
পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিমান পরিবহন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ভলোদিমির বিলটকার ব্যাখ্যা, ইকোনমি ক্লাসের চারটি আসনের সমান জায়গা লাগতে পারে বিজনেস ক্লাসের একটি আসনের জন্য। কিন্তু বিজনেস ক্লাসের প্রতিটি আসনের ভাড়া সাধারণ আসনের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি ধরা যায়। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘বিমান সংস্থাগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই উন্নত ও বিলাসবহুল সেবায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে আসছে। কারণ, এসব সেবা থেকে মুনাফার হার অনেক বেশি।’
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক প্রান্তিকে প্রিমিয়াম শ্রেণির টিকিট বিক্রি থেকে তাদের আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা সাধারণ কেবিনের আয় বৃদ্ধির চেয়ে চার শতাংশ বেশি। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম বাড়ায় ভ্রমণ খাতে নানা জটিলতা দেখা দিলেও প্রিমিয়াম সেবার আয় তাদের জন্য ইতিবাচক দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকান এয়ারলাইনসের তথ্য বলছে, তাদের মোট আসনের প্রায় ৩০ শতাংশ এখন প্রিমিয়াম শ্রেণির, অথচ টিকিট বিক্রির মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে এসব আসন থেকে।
সাধারণ কেবিন আর বিজনেস ক্লাসের চিরাচরিত ভাগের বাইরেও যাত্রীরা এখন বাড়তি পা রাখার জায়গা কিংবা উড়োজাহাজের সামনের সারিতে বসে আগেভাগে নেমে যাওয়ার সুযোগ পেতে সর্বোচ্চ ২০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ করছেন।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনস গত জুলাইয়ে ‘ইকোনমি প্লাস’ নামের নতুন একটি সেবার ঘোষণা দেয়। এতে পাশাপাশি তিনটি আসনের মাঝেরটি ফাঁকা রাখার সুযোগ পাবেন যাত্রীরা। ২০২৬ সালের শেষ দিকে কয়েকটি ফ্লাইটে পরীক্ষামূলকভাবে সেবাটি চালুর পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠানটির। অন্যদিকে দেশের ভেতরের ফ্লাইটের জন্য ‘ব্লুফার্স্ট’ নামের নতুন ফার্স্ট ক্লাস সেবার ঘোষণা জেটব্লু দেয় গত সেপ্টেম্বরে।
জেটব্লুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোয়ানা গেরাঘটি বলেন, ‘যাত্রীরা এখন আগের তুলনায় উন্নত ও বিলাসবহুল ভ্রমণ অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।’
প্রিমিয়াম আসনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে
ভ্রমণবিষয়ক সংবাদমাধ্যম স্কিফটের তথ্য, ২০২০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রিমিয়াম আসন বেড়েছে ৩৩ শতাংশ—সাধারণ আসন বাড়ার হারের দ্বিগুণেরও বেশি।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনস এএফপিকে জানায়, ২০১৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রিমিয়াম আসনের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। সামনে আরও বাড়তি সুবিধার আসন আনার পরিকল্পনা আছে তাদের, যেমন কনুই রাখার বাড়তি জায়গাসহ আসন।
নিজেদের ‘ডেল্টাওয়ান’ সেবায় নতুন করে বিনিয়োগ করেছে ডেল্টা এয়ারলাইনস। সেবাটিতে মিলবে উন্নত মানের ওয়াইন, ওয়াগিউ বার্গারের মতো বিশেষ পদ আর বিনোদনে বড় পর্দা। মেন্যু সাজাতে যুক্তরাজ্যের মিশেলিন তারকাখচিত রেস্তোরাঁর শেফ সাইমন হালস্টোন ও পুরস্কারপ্রাপ্ত সোমেলিয়ার আন্দ্রেয়া রবিনসনের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়েছে ডেল্টা।
নতুন এ সেবা এয়ারবাস এ৩৫০ মডেলের উড়োজাহাজে চালু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এসব উড়োজাহাজে থাকবে প্রায় ১৫০টি প্রিমিয়াম ও ১৬১টি ইকোনমি শ্রেণির আসন।
ডেল্টার অনবোর্ড স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একরেম দিমবিলোগলু বলেন, ‘২০ বছর আগে উড়োজাহাজের ৯০ শতাংশ আসনই ছিল সাধারণ কেবিনের।’ তাঁর ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে ডেল্টার কোনো কোনো ফ্লাইটে মোট আসনের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত প্রিমিয়াম আসন হতে পারে।
তবে বড় কোনো বিমান সংস্থা এখনো ইকোনমি শ্রেণির আসন পুরোপুরি বাদ দিয়ে ফ্লাইট চালানো শুরু করেনি। গত অক্টোবরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ঘোষণা দেয়, তাদের দোতলা এ৩৮০ উড়োজাহাজের ওপরের তলায় কেবল প্রিমিয়াম শ্রেণির আসন থাকবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাবে, বিশ্বের তিন প্রধান বিমান সংস্থা জোট—স্কাইটিম, ওয়ানওয়ার্ল্ড ও স্টার অ্যালায়েন্স—আর মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনসগুলোর সব আসনের মধ্যে প্রিমিয়াম আসন এখন ১৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।
ফ্লাইটে ওঠার আগেই পছন্দের খাবার বেছে নেওয়া আর বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধাও যোগ হচ্ছে প্রিমিয়াম সেবায়। পাশাপাশি নতুন আধুনিক লাউঞ্জ নির্মাণ আর পুরোনোগুলোর সৌন্দর্য বাড়াতে বিনিয়োগ করছে বিভিন্ন বিমান সংস্থা; একসময় কম ভাড়ার সেবার জন্য পরিচিত সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসও এমন উদ্যোগ নিয়েছে।
উচ্চমূল্যের সেবা নিতে সক্ষম যাত্রীদের দিকে বিমান সংস্থাগুলোর এই বাড়তি মনোযোগ অবশ্য স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থাগুলোর সামনে নতুন বাজারের সুযোগ খুলে দিতে পারে। যদিও জ্বালানির চড়া দাম প্রত্যেক বিমান সংস্থার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।