ইউরোভিশন সংগীত প্রতিযোগিতা এই প্রথম এশিয়ায় আসছে, আর এর মঞ্চে একসঙ্গে শোনা যাবে কে-পপের সুর ও বাংলাদেশের বিটবক্সিং। আগামী শনিবার ইউরোপের জনপ্রিয় এই আয়োজনের জমকালো পরিবেশনা, বৈচিত্র্যময় সংগীতধারা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আগামী ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় প্রথম ‘ইউরোভিশন সং কনটেস্ট এশিয়া’য় লাওস, মঙ্গোলিয়া, ফিলিপাইনসহ সব মিলিয়ে ১১টি দেশ অংশ নিচ্ছে। যেসব দেশ অংশ নিচ্ছে, সেগুলোর টিভি চ্যানেল এবং ইউটিউবে আয়োজনটি সরাসরি সম্প্রচারিত হবে। তবে দর্শকেরা কতটা আগ্রহ নিয়ে তা দেখবেন, সে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
ইউরোভিশন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরাসরি টেলিভিশন সংগীত আয়োজন; চলতি ২০২৬ সালে ১৩ কোটি ১০ লাখ দর্শক এটি দেখেছেন। গত ৭০ বছরে এই প্রতিযোগিতা থেকেই বিশ্বসংগীতে পরিচিতি পেয়েছেন অ্যাবা ও সেলিন ডিওনের মতো তারকারা।
বহুজাতিক পরিসরে ইউরোভিশনের প্রথম সম্প্রসারণ ঘটছে এশিয়ার এই আয়োজন দিয়ে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও অবশ্য একবার এর একটি সংস্করণ হয়েছিল, কিন্তু পরে সেটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
অবশ্য ব্যাংককের এবারের প্রতিযোগিতায় ভারত, জাপান ও চীন নেই। টিকিট বিক্রিও এগোচ্ছে প্রত্যাশার চেয়ে ধীরে।
ইউরোভিশনের নির্বাহী প্রযোজক আসাফ ব্লেচার মেনে নিয়েছেন, ‘ইউরোপে ইউরোভিশন অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও এশিয়ায় এটি একেবারেই নতুন।’ তবে তাঁর দাবি, তিন বছরের প্রস্তুতির ফলে অনুষ্ঠানটি ঘিরে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে ইউরোভিশনের মূল ভাবনা বুঝতে পেরেছেন। তারা এর সংগীত ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।’ এএফপিকে তিনি আরও বলেন, ‘এটি অন্য দেশ, তাদের সংগীত, মানুষ ও পোশাক-পরিচ্ছদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি জানালা।’ সামনে এমন আরও অনেক আয়োজন হবে বলে আশা তাঁর।
কিছুটা বিতর্ক ও চমক
চূড়ান্ত প্রতিযোগীদের বাছাই করা হয়েছে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, যাঁদের কয়েকজন নিজ দেশে আগে থেকেই জনপ্রিয় তারকা। যেমন পপ-ড্যান্স সংগীত নিয়ে আসা ভিয়েতনামের টক তিয়েন এবার জয়ের অন্যতম দাবিদার।
কে-পপ তারকা জুনহি লড়বেন দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে। বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে পুরুষ সদস্যদের নিয়ে গড়া অ্যাপেলা বিটবক্সিং দল ‘বিটমোস্ফিয়ার’। আর নেপালের প্রতিনিধি হিসেবে গান গাইবেন প্রতীক হিমাল রাই।
ইউরোভিশনের ৭০ বছর পূর্তির সময়েই এশিয়ায় এর পথচলা শুরু হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের মূল আয়োজনের দর্শক আগের বছরের তুলনায় ৩ কোটি ৫০ লাখ কমে গেছে; ইসরাইল অংশ নেওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়ে পাঁচটি দেশ আয়োজনটি বর্জন করে, আর তাতেই দর্শক কমে যায়।
বিতর্ক অবশ্য ইউরোভিশনের পুরোনো সঙ্গী। ফ্রাঙ্কো-শাসিত স্পেন ষাটের দশকে অংশ নেওয়ায় যে প্রতিবাদ হয়েছিল, কিংবা ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালানোয় ২০২২ সালে রাশিয়াকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া—এমন নানা ঘটনা এর ইতিহাসে জড়িয়ে আছে।
ইউরোভিশনের শুরু ১৯৫৬ সালে, নানা দেশের জাতীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের একটি পরীক্ষামূলক প্রয়াস হিসেবে; পরে তা বড় এক সাংস্কৃতিক আয়োজনে রূপ নেয়। জমকালো মঞ্চসজ্জা, ঝলমলে পরিবেশনা, বৈচিত্র্যময় সংগীতধারা এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বিপুল সমর্থন প্রতিযোগিতাটিকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি যত বেড়েছে, ইউরোভিশনের জনপ্রিয়তাও তত ছড়িয়েছে। এখন অবশ্য এর কার্যক্রম ইউরোপের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে—আগামী বছর এতে যোগ দেবে কানাডাও।
সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতাটি কেবল গানে আটকে থাকেনি, রাজনীতিও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
প্রতিটি দেশের ভোট এখানে দুই ভাগে ভাগ করা—অর্ধেক বিচারকদের, বাকি অর্ধেক দর্শকদের। নিজের দেশকে কেউ ভোট দিতে পারে না, তাই দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ছাপ অনেক সময় ভোটের ফলেও পড়ে।
ব্লেচারের ধারণা, ইউরোভিশন এশিয়াতেও এমনটা দেখা যেতে পারে। তাঁর মতে, গত বছর সীমান্ত নিয়ে সংঘাতে জড়ানো কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের দর্শকেরা পরস্পরের দেশের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন।
ইউরোভিশন এশিয়ার প্রতিযোগীদের বেশিরভাগ গানই অবশ্য প্রেমের গান, যা নিয়ে হতাশা জানিয়েছেন ইউরোভিশনবিষয়ক লেখক ও বিশেষজ্ঞ ডিন ভুলেটিচ। ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি ফিলিপাইনের পপশিল্পী কারমেলের কথা বলেন, যাঁর ‘সোবরা-সোবরা’ (অতিরিক্ত) গানটি নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে প্রাণবন্ত এক পরিবেশনা।
এএফপিকে ভুলেটিচ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দর্শকদের মনে সাড়া জাগাতে পারে—এমন কিছুটা বিতর্ক, চমক কিংবা অর্থবহ বার্তার অভাব রয়েছে এই আয়োজনে।’ তাঁর মতে, ‘ইউরোপের ইউরোভিশনকে অন্যান্য সংগীত প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করেছে এই বিষয়টিই।’
বাজেট সংকট
আয়োজন বাস্তবায়নে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে আয়োজকদের, যার একটি বাজেট থেকে ১০ লাখ ডলার কাটছাঁটের খবর। এমন অবস্থায় গত মাসে প্রতিযোগিতা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হলে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে আয়োজনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হয় আয়োজকদের।
ব্লেচার অবশ্য বাজেট সমস্যাকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বাজেট নিয়ে সব সময়ই কিছু সমস্যা থাকে।’ আরও বলেন, ‘এটি প্রথম আয়োজন। কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হচ্ছে।’ শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে শেষ হবে বলে আশাবাদী তিনি।
চূড়ান্ত পর্বের মহড়ায় অংশ নিতে চলতি সপ্তাহান্তেই শিল্পীদের ব্যাংককে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রতিযোগীদের কেউ গাইবেন নিজের মাতৃভাষায়, কেউ ইংরেজিতে। আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ইংরেজিতে গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালয়েশিয়ার তারকা আইনা আবদুল।
ঐতিহ্যবাহী পোশাকে লোকসংগীত ও পপধারার প্রেমের গান শোনাবেন ভুটানের শিল্পী নিয়েন্দ্র। আট লাখ মাত্র জনসংখ্যার ভুটান থেকে আসা এই শিল্পীর সামনে ইউরোভিশন আন্তর্জাতিক পরিচিতির বড় সুযোগ হয়ে এসেছে।
এই প্রতিযোগিতায় ছোট দেশগুলো দর্শকদের বিশেষ সমর্থন পায়; তুলনামূলক কম পরিচিত দেশগুলোই অনেক সময় সহানুভূতি ও সমর্থন বেশি পেয়ে থাকে। সে হিসেবে নিয়েন্দ্রেরও ভালো করার সম্ভাবনা আছে।
ব্লেচার জানান, এবারের আয়োজন সফল হলে ২০২৭ সালের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে এরই মধ্যে ১৬ থেকে ১৭টি দেশ ও অঞ্চল আগ্রহ দেখিয়েছে। আগ্রহীদের মধ্যে চীন, হংকং ও তাইওয়ানের নামও বলেন তিনি। এসব দেশ যুক্ত হলে ইউরোভিশন এশিয়া যে ভূরাজনৈতিক আলোচনারও এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই।