২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

​বছরে গড়ে ১১ হাজার থেকে ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু

এই ডুবে মৃত্যুর নীরব ব্যর্থতার দায়কার? পানি যেন জীবনের প্রতীকই থাকে, মৃত্যুর জন্য নয়

আপলোড সময় : ২২-০৭-২০২৬
এই ডুবে মৃত্যুর নীরব ব্যর্থতার দায়কার? পানি যেন জীবনের প্রতীকই থাকে, মৃত্যুর জন্য নয় সংগৃহীত ছবি

নজরুল ইসলাম
দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ১৭-১৮ হাজারেরও বেশি। অথচ এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানএবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে টেকসই  কাঠামো গড়ে প্রয়োজন। 

প্রতি বছর বাংলাদেশে পানিতে ডুবে গড়ে ১১ হাজার থেকে ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সাড়ে ছয় বছরে দেশজুড়ে পানিতে ডুবে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ হাজারের মতো শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে বলে, ধারণা করা হয়।
সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থার গবেষণায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

একটি শিশু শুধু বড় জলাশয়ে নয়, অল্পপানিতেও ডুবে মারা যেতে পারে। তাই ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এসব মৃত্যুর নীরব ব্যর্থতার দায়কার ? । বিশেষ করে পরিবারকে বেশী সচেতন হওয়াপ্রয়োজন। কারণ ছেলে-মেয়ে কোথায় গেল তার নজর দানকরতে হবে।

জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৫০ ভাগ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর ১৭-১৮ হাজারের বেশি শিশুসহ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের উৎস, বাজেট লাইন এবং ব্যয়-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশু যত্ন ও সাঁতার সুবিধার মাধ্যমে দেশের ১৬টি জেলায় শিশুযত্ন কেন্দ্র, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ, সিপিআর, নিরাপদ উদ্ধার এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এটি দেশের সকল উপজেলা-জেলায় বৃদ্দি করা এখন সময়ের দাবি।

সভ্যতার জন্ম জলের তীরে। পৃথিবীর প্রাচীনতম নগর, কৃষির সূচনা, বাণিজ্যের বিস্তার এবং সংস্কৃতির বিকাশ—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল নদী ও পানি। মানুষ পানিকে জীবন, পবিত্রতা এবং পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে দেখেছে হাজার বছর ধরে। অথচ সেই জীবনদায়িনী পানিই যখন অবহেলা, বৈষম্য ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে  শিশুর জীবন কেড়ে নেয়, তখন তা আর নিছক দুর্ঘটনা থাকে না; তা পরিণত হয় রাষ্ট্র, সমাজ এবং সম্মিলিত বিবেকের  নীরব ব্যর্থতায়।

২৫ জুলাই পালিত বিশ্ব ডুবে মৃত্যু রোধ দিবস আমাদের সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, ডুবে মৃত্যু বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা কিন্তু সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সংকট। প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়; এদের বড় অংশই শিশু। অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—যেখানে দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং গণসচেতনতার অভাব একে অপরকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।

দেশের ভূগোল যেন পানি এক অনন্ত কাব্য। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, অসংখ্য নদী, খাল, বিল ও পুকুর আমাদের জীবন, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করে রেখেছে। কিন্তু এই জলভূমির দেশেই প্রতিবছর অসংখ্য শিশু নীরবে হারিয়ে যায় পানির অতলে। পরিবারের কান্না সংবাদপত্রের এক কোণে স্থান পেলেও জাতীয় চেতনায় তার প্রতিধ্বনি প্রায়শই পৌঁছায়  না। অথচ প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া শিশু একটি অপূর্ণ ভবিষ্যৎ,  অপূর্ণ স্বপ্ন এবং একটি জাতীয় সম্ভাবনার অবসান।

ডুবে মৃত্যু কোনো ভাগ্যের লিখন নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য। আধুনিক জনস্বাস্থ্যবিদ্যা বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে, সাঁতার শিক্ষা, শিশুদের নিবিড় তত্ত্বাবধান, নিরাপদ ডে-কেয়ার, জলাশয়ের সুরক্ষা, নৌযানে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের ব্যবহার ,গণসচেতনতাএবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুর বড় অংশই এড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ এখানে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের ইচছা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের বন্যা, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং নতুন বাস্তবতা। প্রতিটি দুর্যোগের সঙ্গে বাড়ছে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি। ফলে ডুবে মৃত্যু রোধ এখন শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়নেরও অপরিহার্য অংশ। জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলোচনায় মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার প্রশ্নটি তাই সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এমন একটি সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করতে বলেছে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে।  শিশুর প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকারেরও অপূর্ণতা প্রকাশ করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল দুর্ঘটনার পর সহানুভূতি জানানো নয়; দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জননিরাপত্তা কোনো দয়া নয়; এটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। প্রতিটি গ্রামে নিরাপদ শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক পানি নিরাপত্তা শিক্ষা, সবার জন্য সাঁতার শেখার সুযোগ, প্রতিটি নৌযানে মানসম্মত লাইফ জ্যাকেট, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা—এসব উদ্যোগকে উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় আনতে হবে। জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ—এই পাঁচটি খাতের সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

মানবসভ্যতার ইতিহাস বলে, একটি সমাজের মহত্ত্ব তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়; সবচেয়ে দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায় পরিমাপ করা হয়। 
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা কিংবা স্মার্ট নগরায়ণের কথা আমরা বলি। কিন্তু সেই একই পৃথিবীতে যদি একটি শিশু কেবল সাঁতার না জানার কারণে কিংবা নিরাপদ তত্ত্বাবধানের অভাবে প্রাণ হারায়, তবে সেই উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি প্রযুক্তির উৎকর্ষে নয়; মানুষের জীবনকে কতটা নিরাপদ করা গেল, তার মধ্যেই নিহিত।

বিশ্ব ডুবে মৃত্যু রোধ দিবস ২০২৬ আমাদের তাই নতুন করে ভাবতে শেখায়—পানি কেবল প্রকৃতির সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং মানবাধিকারেরও বিষয়। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা যেমন একটি নৈতিক কর্তব্য, তেমনি উন্নয়নগত দায়িত্ব।

প্রতি বছর দেশে পানিতে ডুবে গড়ে ১১ হাজার থেকে ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সাড়ে ছয় বছরে দেশজুড়ে পানিতে ডুবে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ হাজারের মতো শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়।
সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থার গবেষণায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বার্ষিক গড়: দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৭৭ থেকে ৮৩ শতাংশই শিশু।

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশের কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে অভিভাবকের ব্যস্ততার সময়ে বেশিরভাগ শিশুর প্রাণহানি ঘটে।

শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে মৃত্যু। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ছোট শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।

কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু এখন সবচেয়ে বড় কারণগুলোরএকটি। একটি। এই বয়সী শিশুরা সাধারণত বাড়ির আশপাশেই থাকে। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে মায়েরা যখন গৃহস্থালির কাজ বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন অল্প সময়ের অসাবধানতায় শিশুরা জলাশয়ের কাছে চলে যায় তখনিই এই দুর্ঘটনা ঘটে।’

পানি যেন জীবনের উৎসই থাকে, মৃত্যুর নয়। কোনো শিশুর হাসি যেন আর অবহেলার ঢেউয়ে হারিয়ে না যায়। সচেতন পরিবার, দায়িত্বশীল সমাজ, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি এবং মানবিক রাষ্ট্র—এই চার স্তম্ভের ওপরই নির্মিত হতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নদী জীবন বহন করবে, শোক নয়; প্রতিটি জলধারা হবে সম্ভাবনার প্রতীক, অকালমৃত্যুর নয়। এটাই হোক বিশ্ব ডুবে মৃত্যু রোধ দিবসের অঙ্গীকার।
 লেখক : গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ