এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা ও রমজান মাসের কারণে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা হলে ‘ব্যবসায়িক ও মানবিক ঝুঁকি নিয়ে’ তাতে অংশগ্রহণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা হলে তাতে ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে’ অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখিয়ে এই প্রকাশকরা বলেছেন, মেলা সফল করতে কর্তৃপক্ষকে তারা ‘সর্বাত্মক সহযোগিতা’ করবেন।
বিবৃতিতে সই করা ৩২১ জন সৃজনশীল প্রকাশকের ভাষ্য, "বাংলা একাডেমি আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ শুরুর যে ঘোষণা দিয়েছে, তা বাস্তবতাবিবর্জিত, আত্মঘাতী এবং প্রকাশনা শিল্পকে প্রবল অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।"
মেলা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া প্রকাশকদের একজন অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচন-পরবর্তী অনিশ্চিত সময়ে, উপরন্তু রমজান মাসে আমাদের কষ্টার্জিত পুঁজির ঝুঁকি নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে সম্ভাব্য পাঠকশূন্য বইমেলায় অংশ নেব না বলে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঈদের পর উপযুক্ত সময়ে মেলা আয়োজনে আমাদের অংশগ্রহণ এবং পূর্ণ সহযোগিত থাকবে।" কেন ঈদের পরে বইমেলা চান?
প্রকাশকদের বিবৃতিতে বলা হয়, ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে মাত্র কয়েকদিন পরেই রমজান শুরু হবে। রোজার দিনে তীব্র গরম ও যানজট ঠেলে পাঠকরা মেলায় ‘আসবেন না’। পাঠকহীন মেলা প্রকাশক ও আয়োজক—উভয়ের জন্যই ‘বিব্রতকর’।
মেলার স্টলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করে, সে কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, "সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও তারাবি নামাজের পর এই শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ করানো অমানবিক। আমরা আমাদের কর্মীদের এই কষ্টের মধ্যে ফেলতে চাই না।"
গত দেড় বছরে প্রকাশনা শিল্প ‘চরম মন্দার’ ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকাশকদের ভাষ্য। তারা বলছেন, "এই পরিস্থিতিতে আরও একটি অসফল মেলায় অংশ নিয়ে অবশিষ্ট পুঁজি হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।"
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: 'ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত' প্রকাশকরা
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সভায় প্রকাশক প্রতিনিধিদের নিয়েই বইমেলা ২০ ফেব্রুয়ারি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।
গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সেলিম রেজা বলেছেন, "বইমেলা আয়োজনের কাজ যখন প্রায় ৬০ ভাগ সম্পন্ন, তখন কিছু সম্মানিত প্রকাশক ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা প্রকাশকদের বক্তব্য শুনেছি। তাদেরকে বলা হয়েছে–কেন ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করা দুরুহ।
"তখন এপ্রিল মাস এসে যাবে। এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ থাকে। ধুলোবালির উপদ্রব বাড়ে। কালবৈশাখীসহ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকে প্রবল। এই সময় মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা বাস্তবসম্মত নয়।"
বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সেলিম রেজা সেদিন লিখিত বক্তব্যে বলেন, গতবছর যেসব প্রকাশনা সংস্থা মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্য থেকে ৫২৭টি এবং নতুন ৫৩টি প্রতিষ্ঠান এবার বইমেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে স্টলের জন্য আবেদন করেছে। ইতোমধ্যে পুরনো ৫২৭টি এবং নতুন ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি শতাধিক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণের জন্য স্টল বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে।
ফেব্রুয়ারিতে মেলা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া প্রকাশকদের বিবৃতিতে বলা হয়, "বাংলা একাডেমি এপ্রিলে ঝড়-বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়েছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—ঈদের পরে মেলা হলে যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়, সেই ঝুঁকি আমরা নিতে প্রস্তুত। কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে মেলা করে নিশ্চিত ব্যবসায়িক মৃত্যুর ঝুঁকি আমরা নেব না।"
তারা বলছেন, তারা বইমেলার ‘বিপক্ষে নন’ বরং বইমেলা সফল করতে আয়োজক কর্তৃপক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত’।