বাংলার চলচ্চিত্র জগতের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আশি ও নব্বইয়ের দশকে যাঁর একঝলক হাসিতে কুপোকাত হতো দুই বাংলার আপামর দর্শক, সেই প্রিয় ‘সাহেব’ আজ নেই। আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি, জনপ্রিয় অভিনেতা তাপস পালের চতুর্থ প্রয়াণ দিবস। ২০২০ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র ৬১ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। পর্দার সেই চিরসবুজ নায়ক বাস্তবে না থাকলেও, তাঁর রেখে যাওয়া কাজ এবং অগণিত স্মৃতি আজও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
বাংলার চিরসবুজ নায়ক: এক কালজয়ী অধ্যায়
তাপস পাল মানেই একরাশ সারল্য আর অসামান্য অভিনয় দক্ষতা। তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপোলি পর্দায় তাঁর অভিষেক ছিল রূপকথার মতো। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলা সিনেমা এক নতুন Superstar-কে পেতে চলেছে। এরপর ‘সাহেব’, ‘পারাবত প্রিয়া’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ কিংবা ‘অনুরাগের ছোঁয়া’-র মতো একের পর এক ব্লকবাস্টার উপহার দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক অনন্য উচ্চতায়। ‘সাহেব’ সিনেমার জন্য তাঁর ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক।
স্মৃতিতে অমলিন: নন্দিনী পালের আবেগঘন পোস্ট
প্রিয় মানুষের চলে যাওয়ার শূন্যতা যে কতখানি গভীর, তা ফুটে উঠেছে অভিনেতার স্ত্রী নন্দিনী মুখার্জি পালের সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায়। স্বামীর প্রয়াণ দিবসে স্মৃতির সরণি বেয়ে আবেগঘন এক পোস্ট করেছেন তিনি। সেখানে উঠে এসেছে ভালোবাসা, না-বলা কথা আর চিরস্থায়ী এক শূন্যতার আখ্যান। নন্দিনী তাঁর বার্তায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, জীবনের কোলাহল থেকে দূরে সরে গেলেও তাপস পাল আজও তাঁর প্রতিদিনের অস্তিত্বে মিশে আছেন। ভক্তদের কাছে তিনি অভিনেতা হলেও, পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষ, যাঁর অভাব আজও প্রতিটি মুহূর্তে অনুভূত হয়।
নস্টালজিয়া ও রুপোলি পর্দার ম্যাজিক
সময়ের আবর্তে বাংলা সিনেমার ধারা বদলেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবর্তন এসেছে শ্যুটিং স্টাইলে। কিন্তু তাপস পালের অভিনীত সিনেমাগুলোর প্রতি দর্শকদের টান আজও বিন্দুমাত্র কমেনি। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তিনি যেমন সফল ছিলেন, তেমনি পারিবারিক ও আবেগপ্রবণ চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও চোখে জল আনে দর্শকদের। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল বাংলার যুবকদের কাছে তিনি ছিলেন এক আইকন। আজও যখন টেলিভিশন বা Digital Platform-এ তাঁর অভিনীত ‘গুরুদক্ষিণা’ কিংবা ‘মায়ার বাঁধন’ সম্প্রচারিত হয়, দর্শক ফিরে যান সেই স্বর্ণালী নস্টালজিয়ার দিনগুলোতে।
অমর এক উত্তরাধিকার (Legacy)
মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং এক নতুন যাত্রার শুরু—তাপস পালের ক্ষেত্রে এই কথাটি চিরন্তন সত্য। টলিউড বা টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় তাঁর উত্তরসূরিরা আজও তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা শোকবার্তা ও তাঁর জনপ্রিয় সব ডায়ালগ শেয়ার করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। যদিও শেষ বয়সে বিতর্ক এবং অসুস্থতা তাঁকে কিছুটা আড়াল করেছিল, কিন্তু শিল্পী তাপস পালের অবদানকে অস্বীকার করার সাধ্য কারও নেই।
বাংলার আকাশ-বাতাসে তাঁর হাসি আর সংলাপে আজও মিশে আছেন তিনি। তাপস পাল চিরকালই থাকবেন বাঙালির ড্রয়িংরুমের গল্পে আর রুপোলি পর্দার ধ্রুবতারা হয়ে।