যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার মোহিনীকাঠি গ্রামের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে এখন রঙের মেলা। প্রচলিত সাদা ফুলকপির ভিড়ে বেগুনি আর হলুদ রঙের ফুলকপিগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো শিল্পীর নিপুণ তুলিতে আঁকা ছবি। এই রঙিন বিপ্লবের কারিগর স্থানীয় কৃষক মো. আলমগীর হোসেন। কেবল চোখের প্রশান্তিই নয়, বিষমুক্ত উপায়ে এই আধুনিক সবজি চাষ করে তিনি এখন লাভের মুখ দেখছেন, যা অঞ্চলের অন্য কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জৈব পদ্ধতিতে কৃষি বিপ্লব ও ‘অর্গানিক’ স্বাদ
মোহিনীকাঠি গ্রামের আহাদ আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন আড়াই মাস আগে তাঁর ২০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ইউনাইটেড (শিলা)’ জাতের পাঁচ রঙের ফুলকপি রোপণ করেন। তবে তাঁর এই চাষাবাদের বিশেষত্ব হলো শতভাগ বিষমুক্ত পদ্ধতি। জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেছেন ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার)। ক্ষতিকারক পোকা দমনে ব্যবহার করেছেন সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ (Sex Pheromone Trap) এবং হলুদ ফাঁদের মতো পরিবেশবান্ধব কৌশল। আলমগীর জানান, সম্পূর্ণ জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করায় এই ফুলকপির স্বাদ সাধারণ কপির চেয়ে অনেক বেশি এবং এর বর্ণও অত্যন্ত উজ্জ্বল।
নামমাত্র খরচে বিপুল মুনাফা
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগে আলমগীর হোসেনের প্রফিট মার্জিন (Profit Margin) দেখে রীতিমতো অবাক স্থানীয়রা। তিনি জানান, জমি প্রস্তুত, সেচ এবং জৈব সার বাবদ তাঁর মোট বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৫ হাজার টাকা। গত ২০-২৫ দিনেই তিনি ক্ষেত থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছেন। বাজারে প্রতিটি কপি দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের হচ্ছে এবং পাইকারি বাজারে প্রতি কেজির দর মিলছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। অন্যান্য সবজির তুলনায় এর চাষাবাদে পরিশ্রম কম হলেও আর্থিকভাবে এটি অনেক বেশি লাভজনক বলে তিনি মনে করেন।
পুষ্টি ও স্বাদের অনন্য মিশেল
রঙিন ফুলকপি কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বেগুনি ফুলকপিতে প্রচুর পরিমাণে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ এবং হলুদ কপিতে ‘বিটা-ক্যারোটিন’ থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। বাজারে সাধারণ সাদা ফুলকপির চেয়ে এর প্রতি ক্রেতাদের বিশেষ আকর্ষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ করায় সচেতন ক্রেতারা বাড়তি দাম দিয়ে এই ‘অর্গানিক’ সবজি কিনছেন।
সরকারি সহায়তা ও আগামীর সম্ভাবনা
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নূরুল ইসলাম জানান, যশোর অঞ্চলে ‘টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প ২০২৫-২৬’-এর আওতায় আলমগীর হোসেনকে উন্নত জাতের চারা, সার এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, “জৈব সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে সবজির গুণমান অনেক উন্নত হয়েছে। কৃষক আলমগীরের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অল্প জমিতেও সাস্টেইনেবল ফার্মিং (Sustainable Farming) বা টেকসই কৃষির মাধ্যমে ভাগ্য বদলানো সম্ভব।”
যশোরের এই রঙিন ফুলকপির সাফল্য এখন ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রামগুলোতেও। আলমগীরের এই মডেল অনুসরণ করে আগামীতে ঝিকরগাছায় বিষমুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।