• দেশজুড়ে
  • প্রকৃতির রোষে নারায়ণগঞ্জের 'ফুলের রাজধানী': অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বিপন্ন কয়েকশ চাষির স্বপ্ন

প্রকৃতির রোষে নারায়ণগঞ্জের 'ফুলের রাজধানী': অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বিপন্ন কয়েকশ চাষির স্বপ্ন

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
প্রকৃতির রোষে নারায়ণগঞ্জের 'ফুলের রাজধানী': অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বিপন্ন কয়েকশ চাষির স্বপ্ন

বন্দরে ১৫ হেক্টর জমিতে কমেছে চাষ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ভরা মৌসুমেও লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা কৃষকেরা।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে এখন হরেক রঙের ফুলের মেলা। লাল, নীল, হলুদ আর বেগুনি আভার সেই সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের। কিন্তু এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে চাষিদের দীর্ঘশ্বাস। গত বর্ষা মৌসুমের অতিবৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে এ বছর নারায়ণগঞ্জের ফুল চাষে বড় ধরনের ধস নেমেছে। যথাসময়ে চারা রোপণ করতে না পারা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসানের (Financial Loss) আশঙ্কায় দিন কাটছে স্থানীয় চাষিদের।

বর্ষার দাপট ও চাষে ধস

শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদি, দীঘলদি, মাধবপাশাসহ অন্তত ১০টি গ্রাম গত দুই যুগ ধরে ফুলের জন্য পরিচিত। প্রায় ৫৫০ বিঘা জমিতে এখানে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হয়। তবে এবারের চিত্রটি ভিন্ন। বন্দর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত বছর যেখানে ৮০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছিল, এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৫ হেক্টরে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে চাষ কমেছে প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে। মূলত ড্রেনেজ সিস্টেম বা পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার পানি জমিতে আটকে ছিল দীর্ঘ সময়। ফলে চাষিরা তাদের ‘Production Cycle’ অনুযায়ী সঠিক সময়ে বীজ বপন ও চারা রোপণ করতে পারেননি।

৪০ প্রজাতির ফুল ও বিপণন সংকট

নারায়ণগঞ্জের এই অঞ্চলে দেশি-বিদেশি অন্তত ৪০ প্রজাতির ফুল চাষ হয়। এর মধ্যে গাঁদা, চেরি, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, সূর্যমুখী, গ্ল্যাডিওলাস, ডালিয়া এবং জিপসির মতো ‘Cash Crop’-এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ফেব্রুয়ারি মাসকে বলা হয় ফুল ব্যবসার ‘Peak Season’। পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে সারা দেশের ফুলের বাজারে যে বিপুল ‘Demand’ থাকে, তার একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে এখান থেকেই ফুল যায়। কিন্তু এ বছর ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কম হওয়ায় বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ (Supply Chain) বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বনাম চাষিদের দীর্ঘশ্বাস

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে সাবদি ও দীঘলদি গ্রাম এখন জনপ্রিয় এক পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সপরিবারে আসছেন বাগানের তাজা ফুলের ঘ্রাণ নিতে। দর্শনার্থীরা বাগান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তাজা ফুল কিনছেন ঠিকই, কিন্তু চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এক চাষি জানান, "বিগত বছরগুলোতে যে পরিমাণ লাভ হতো, এবার তার অর্ধেকও উঠবে না। সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ যে ‘Investment’ করা হয়েছে, তা তুলে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।" কৃষকদের দাবি, এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রয়োজন।

কৃষি ঋণের আশ্বাস ও সরকারি পরিকল্পনা

ফুল চাষে এই বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করে বন্দর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন আরাফাত জানান, ফুল চাষ নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা। তিনি বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা তাদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। কৃষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে ‘Batch-based Training’ বা ব্যাচভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণ (Agri-Loan) প্রদানের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করেছি। আশা করছি, সরকার এই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফুল চাষ একটি বর্ধনশীল খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নারায়ণগঞ্জের এই ‘ফুলের রাজধানী’ রক্ষা করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।