তিনি বলেন, পিলখানার ঘটনা পরিক্রমায় জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামোর ‘দুর্বলতা’ ফুটে উঠেছে।
বুধবার বিকালে সেনানিবাসে আর্মি মাল্টিপারপাস হলে জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে ওই ঘটনা।
সেই বিদ্রোহের পর সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিডিআরের নাম বদলে যায়, পরিবর্তন আসে পোশাকেও। এ বাহিনীর নাম এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ গঠনে সেনাবাহিনীর রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস। সেনা বাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
“আমি মনে করি, পিলখানার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার একটি অপপ্রয়াস।” তিনি বলেন, “পিলখানার ঘটনা পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামোর দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তাই বহিঃবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামোকে আরো আধুনিক সময় উপযোগী এবং শক্তিশালী করা প্রয়োজন অবশ্যই এবং এই লক্ষ্যেই আমাদের সরকার কাজ করবে সবসময়।”
“একই সাথে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি আমরা এই ব্যক্ত করেছি।”
পিলখানার ঘটনা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “মাহে রমজান আমাদের সংযম এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন শহীদদের আত্মাকে শান্তিতে রাখেন, তাদের পরিবারেরকে ধৈর্য ও শক্তি দান করেন এবং আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান সম্মুখে ন্যায় শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব পথে পরিচালিত করেন।”
‘সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আধুনিক করব’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ জনগণের রায় নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দেশের প্রশ্নে আমরা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আরও আধুনিক ও সুসংহত করবো ইনশাআল্লাহ।
“আমাদের সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উৎকর্ষতায় সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবেন ইনশাআল্লাহ।”
‘আমরা কন্ঠ ভারী হয়ে উঠছে’
তারেক রহমান বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার বেদনা সময় পেরিয়ে আজও বহমান।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর পরে শহীদের স্মৃতি বিজড়িত এই প্রাঙ্গণে আজ আমার কন্ঠ কিছুটা স্বাভাবিকভাবে ভারী হয়ে উঠছে।
“আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতন আপনাদের সামনে, আপনাদের সাথে উপস্থিত হয়েছি।”
সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ ঝরে যাওয়ার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিতে যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানো বেদনাবিদুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য।”
তিনি বলেন, “আমি দেশের তত্ত্বাবধায়নের পরপরই বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছি…গত ১৭ বছরে আপনাদের দূর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুন যন্ত্রণা।
“আমি বিশ্বাস করি, পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা হবে আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।”
পিলখানার সেই ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়ত ক্ষমা করবে না, এ কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “তাই সেনাবাহিনী ও আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকার ইনশাল্লাহ কাজ করবে।”
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শিকড় স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথিত, এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যেদিন চট্টগ্রামের কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেদিন সেনাবাহিনীর সাথে তদানীন্তন ইপিআর সদস্যরা বেতার কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর সাথে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে চলেছেন।
জিয়াউর রহমানের সময় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সুসংহত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, সে সময় সেনাবাহিনী থেকে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রেষণে পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো হয়। ১৯৭৮ সালে এই বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল সামরিক কায়দায় নতুন করে পুনর্গঠিত করা। তখন দুটি নতুন ব্যাটেলিয়ান সংযোজন করে বাহিনীর সংগঠনকেও পরিবর্ধিত করা হয় বলে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীসহ পিলখানায় নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ টি এ শামসুল ইসলাম, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানও ছিলেন।
পরে প্রধামন্ত্রী শহীদ পরিবারের সঙ্গে ইফতার করেন।