• জাতীয়
  • দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার তথ্য লুকিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর

দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার তথ্য লুকিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার তথ্য লুকিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর

দুবাইয়ের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানায় মেয়ে মেহেরীন সারাহ মনসুরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নামও ছিল।

সেখানকার ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, আহসান এইচ মনসুরও ওই ফ্ল্যাটের মালিক। তার নাম ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে আছে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন।

আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, ওই ফ্ল্যাটটি তার মেয়ের সম্পত্তি এবং ফ্ল্যাটটি ২০২৩ সালে কেনা। সেখানে তার নাম কেবল সম্পত্তির মালিকের (সারাহ মনসুর) বাবা হিসেবে এসেছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, আমার মেয়ে বিবাহিত এবং ব্যবসার কারণে দুবাইতে তার স্বামী ও সন্তানদের সাথে থাকে। তার বয়স প্রায় ৪০ বছর।

সে নিজেই এমন একটি বাড়ি কিনতে পারে। এর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে দুবাইয়ের অফিসিয়াল দলিল, সাইন রেকর্ড ও রেজিস্ট্রেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।

আল জাদাফ কমিউনিটির ওই ভবনের নাম পালাজ্জো ভারসিকা, যা দুবাইয়ের অত্যন্ত অভিজাত এবং ব্যয়বহুল আবাসিক প্রকল্প।

মাশরেক ব্যাংক পিএসসির কাছে মর্টগেজ দেওয়া প্রোপার্টি নম্বর ২৭১৬। ফ্লোর নম্বর ৭। ওই ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৩৪১৪৮০/২০২৪। এক কোটি ৩৫ লাখ দিরহাম দিয়ে ফ্ল্যাটটি কেনা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফ্ল্যাটটি ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রেজিস্ট্রেশন করা। ওই দিন গভর্নর দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন।

এ নিয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেশ সমালোচনা দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ওই সমালোচনার জবাবে গভর্নর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনি এই ফ্ল্যাটের কথা জানতে পারেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন এটা তার মেয়ের, ২০২৩ সালের কেনা। তিনি একটি টাকাও কখনও বিদেশে পাঠাননি।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ওই ফ্ল্যাটের দলিলে মালিকানার স্থানে স্পষ্ট দুজনের নাম রয়েছে। প্রথমে নাম রয়েছে মেহেরীন সারাহ মনসুর এবং পরে রয়েছে আহসান হাবিব মনসুর। এখানে আহসান এইচ মনসুরের নাম ‘বাবা’ হিসেবে, বা ‘অভিভাবক’ হিসেবে আলাদা করে উল্লেখ ছিল না।

দুবাইয়ের ভূমি আইন ২০০৬ এর ৭ নং ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ প্রকৃত মালিক না হয়ে কেবল অভিভাবক হয়ে যুক্ত থাকেন, তাহলে তা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। শুধু নাম উল্লেখ থাকলে সেটি সরাসরি আইনগত মালিকানা হিসেবেই গণ্য হয়।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, ওই ফ্ল্যাটের মালিক মেহেরীন সারাহ মনসুরের বাবা হিসেবে আহসান এইচ মনসুরের নাম এসেছে এ তথ্য দলিলগতভাবে সঠিক নয়।

দলিল ছাড়া আরও কিছু তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর দলিল রেজিস্ট্রেশনের দিনে সশরীরে দুবাই ছিলেন।

দাপ্তরিক ভ্রমণের তথ্যে দেখা যায়, আহসান এইচ মনসুর ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুবাই যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি ২০ ডিসেম্বর জিবুতি যান। সেখান থেকে ২২ ডিসেম্বর ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স ইটি ৩৬৫ চড়ে আদ্দিস আবাবা যান। একইদিন ইটি ৬০০ এয়ারলাইন্স চড়ে ২৩ ডিসেম্বর রাত ২টা ৫৫ মিনিটে দুবাই পৌঁছান আহসান এইচ মনসুর। ২৪ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে এমিরেটস ইকে ফ্লাইটে চড়ে দুবাই ইন্টারন্যাশানাল এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

তাছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গভর্নর ও তার দুই সফরসঙ্গী কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তার আলাদা তিনটি বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদেশ জারির তথ্য পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, তার এক সফরসঙ্গীর দুবাইয়ে মাশরেক ব্যাংকের সঙ্গে একটি স্ট্রাটেজিক মিটিংয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।

জানা গেছে, আহসান এইচ মনসুর ও তার মেয়ের নামে কেনা ফ্ল্যাটটি দুবাইয়ের মাশরেক ব্যাংকে মর্টগেজ বা বন্ধক ছিল।

এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তাদের মাশরেক ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের কোনো বিষয় নিয়ে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো এজেন্ডার তথ্য দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি।

ফলে ওই ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তার সঙ্গে প্রাপ্ত দলিলের তথ্য, দুবাই ভ্রমণের তথ্য ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যপ্রমাণাদির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আহসান এইচ মনসুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আহসান এইচ মনসুরকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় মো. মোস্তাকুর রহমানকে। এ বিষয়ে বিকেলে সচিবালয় থেকে বের হওয়ার সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অনেক কিছুরই পরিবর্তন হবে। এখানেও পরিবর্তন হয়েছে। এটা নতুন কিছু না।’