সংসারের কঠিন সময়ে মানুষ অনেক কিছুই বিসর্জন দেয়, কিন্তু যখন সেই ত্যাগ প্রিয় জীবনসঙ্গীর সুস্থতার জন্য হয়, তখন তা কেবল ত্যাগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—হয়ে ওঠে এক অনন্য জীবনসংগ্রাম। ঢাকাই শোবিজের পরিচিত মুখ, জনপ্রিয় অভিনেতা প্রাণ রায় এখন তেমনই এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতিমান নির্মাতা ও তাঁর সহধর্মিণী শাহনেওয়াজ কাকলীর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজের শখের প্রাইভেট কারটি বিক্রি করে দিয়েছেন এই অভিনেতা।
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও স্ট্রোকের ছোবল ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের অক্টোবরে। হঠাৎ করেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয় শাহনেওয়াজ কাকলীকে। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি 'ব্রেন স্ট্রোক' (Stroke) করেছেন। টানা দুই মাস নিবিড় চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করলে তাঁকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং জটিলতা দেখা দেয়। বর্তমানে তিনি সাভারের সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (CRP)-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসার ব্যয় ও দৈনন্দিন সংগ্রাম অসুস্থতার ফলে কাকলীর শরীরের একাংশ বর্তমানে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। প্রাণ রায় জানিয়েছেন, স্ট্রোকের প্রভাবে তাঁর স্ত্রীর মুখের একাংশ বেঁকে গেছে এবং কথা বলার স্বাভাবিক ক্ষমতাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সিআরপিতে বর্তমানে তাঁর নিবিড় 'ফিজিওথেরাপি' (Physiotherapy) ও রিহ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়া চলছে।
চিকিৎসা খরচের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রাণ রায় বলেন, “প্রতিদিন গড়ে আট হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। নিয়মিত তিনটি করে থেরাপি দিতে হচ্ছে তাঁকে। দীর্ঘদিনের এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সামলানো এখন রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তবে আশার কথা হলো, দীর্ঘ প্রচেষ্টায় কাকলীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে; এখন তিনি নিজ হাতে খাবার খেতে পারছেন এবং সহায়তার মাধ্যমে কিছুটা সময় বসতে সক্ষম হচ্ছেন।
প্রিয় গাড়ি বিসর্জন ও ক্যারিয়ারের সংকট স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে এবং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কোনো আপস করতে রাজি নন প্রাণ রায়। আর্থিক সংকট ঘনীভূত হওয়ায় সম্প্রতি তিনি তাঁর শখের গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন। একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য শুটিংয়ে যাতায়াত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গাড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, স্ত্রীর সুস্থতার সামনে একে তুচ্ছ মনে করেছেন তিনি।
পাশাপাশি, স্ত্রীর সার্বক্ষণিক সেবা এবং হাসপাতালের দৌড়ঝাঁপে প্রাণ রায়ের পেশাগত ব্যস্ততাও প্রায় বন্ধের পথে। নতুন কোনো কাজে নিয়মিত সময় দিতে না পারায় তাঁর ব্যক্তিগত আয়ের উৎসও সীমিত হয়ে এসেছে। প্রাণ রায় বলেন, “পরিবার ও কাছের বন্ধুদের সহযোগিতা পাচ্ছি, কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্য ও চিকিৎসার আকাশচুম্বী ব্যয়ের কাছে তা অপ্রতুল। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে হয়তো সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করতে হবে।”
শিল্পীদের পাশে কে আছে, কে নেই? সংকটের এই মুহূর্তে সহকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ ফুটে উঠেছে এই অভিনেতার কণ্ঠে। তিনি জানান, 'অভিনয় শিল্পী সংঘ' শুরু থেকেই শাহনেওয়াজ কাকলীর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং খোঁজখবর রাখছে। তবে কাকলী একজন গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়া সত্ত্বেও 'পরিচালক সমিতি'র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত কোনো সাড়া বা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
শাহনেওয়াজ কাকলী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর সৃজনশীল কাজ যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি জাতীয় স্বীকৃতিও এনে দিয়েছে। আজ তাঁর এই দুর্দিনে ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের সংহতি প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক জনম ও এক লড়াই প্রাণ রায় ও শাহনেওয়াজ কাকলীর এই সংগ্রাম কেবল একটি পরিবার বা দম্পতির গল্প নয়, এটি অনিশ্চিত সময়ে এক শিল্পীর জীবনযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি। একদিকে স্ট্রোকের সঙ্গে শারীরিক লড়াই করছেন নির্মাতা কাকলী, অন্যদিকে তাঁর পাশে থেকে আর্থিক ও মানসিক দেয়াল হয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাণ রায়। ভক্ত ও অনুরাগীদের প্রার্থনা, দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও প্রিয় আঙিনায় ফিরে আসুক এই শিল্পী দম্পতি।