ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে যা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে। শ্রীদেবী তেমনই এক কালজয়ী নাম। যার চোখের জাদুতে মোহিত ছিল কয়েক প্রজন্ম, আর যার অভিনয় দক্ষতায় বলিউড পেয়েছিল তার প্রথম মহিলা ‘সুপারস্টার’ (Superstar)। তবে ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের একটি বিলাসবহুল হোটেলের বাথটাব থেকে উদ্ধার হওয়া তাঁর নিথর দেহ শুধু ইন্ডাস্ট্রিকেই নয়, পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আজ এত বছর পরও সেই প্রয়াণের নেপথ্যে থাকা রহস্যের জট পুরোপুরি খোলেনি।
এক নক্ষত্রের উদয়: শিশুশিল্পী থেকে প্যান-ইন্ডিয়ান আইকন ১৯৬৩ সালের ১৩ আগস্ট তামিলনাড়ুর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গের আয়াপ্পন মাত্র চার বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তামিল সিনেমা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে তেলুগু, মালয়ালম এবং কন্নড় চলচ্চিত্রে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। সত্তরের দশকের শেষভাগে যখন তিনি বলিউডে পা রাখেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন যুগের। ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, ‘চাঁদনি’ কিংবা ‘লামহে’—প্রতিটি ছবিতেই তিনি নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। রোমান্টিক ডান্স নম্বর হোক কিংবা জটিল আবেগঘন দৃশ্য, শ্রীদেবী ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
বলিউডের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক ও ‘ফিমেল সুপারস্টার’ তকমা নব্বইয়ের দশকে যখন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগত পুরুষ অভিনেতাদের শাসনে ছিল, তখন শ্রীদেবীই প্রথম সেই প্রথা ভেঙেছিলেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রী, যার স্টারডম অনেক সময় তথাকথিত হিরোদেরও ছাপিয়ে যেত। পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি জিতেছেন 'পদ্মশ্রী' (Padma Shri), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একাধিক ফিল্মফেয়ার। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা বা 'Versatility' তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এক উচ্চতায়।
অনবদ্য কামব্যাক ও শেষ অধ্যায় দীর্ঘ ১৫ বছরের এক বিরতি ভেঙে ২০১২ সালে ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ সিনেমার মাধ্যমে যখন তিনি পর্দায় ফিরলেন, সমালোচকরা একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন—সিংহাসন আজও তাঁরই দখলে। ‘গ্লোবাল আইকন’ (Global Icon) হিসেবে তাঁর এই শক্তিশালী ‘কামব্যাক’ (Comeback) ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। এরপর ২০১৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘মম’ (Mom), যেখানে তাঁর অভিনয় আবারও দর্শকদের অশ্রুসিক্ত করেছিল। কে জানত, পর্দার সেই সংবেদনশীল মা বাস্তব পৃথিবী থেকেও এত দ্রুত বিদায় নেবেন।
দুবাইয়ের সেই অভিশপ্ত রাত ও অমীমাংসিত রহস্য ২০১৮ সালের সেই ফেব্রুয়ারি মাস। একটি পারিবারিক বিয়েতে যোগ দিতে দুবাই গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে হোটেলের কক্ষ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর মরদেহ। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ‘দুর্ঘটনাজনিত জলে ডুবে মৃত্যু’ বা 'Accidental Drowning' বলা হলেও, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ (Media Trial)।
তদন্ত প্রক্রিয়া, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং স্বামী বনি কাপুরের জবানবন্দি—সবকিছুই বারবার আতসকাচের নিচে এসেছে। কোনো কোনো মহল থেকে দাবি করা হয়েছিল এটি স্রেফ দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গূঢ় রহস্য। দীর্ঘ তদন্তের পর দুবাই পুলিশ মামলাটি বন্ধ ঘোষণা করলেও, সাধারণ মানুষের মন থেকে সংশয় পুরোপুরি দূর হয়নি। এমনকি আজও ইন্টারনেটে শ্রীদেবীর প্রয়াণ রহস্য নিয়ে তৈরি হয় অজস্র ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ (Conspiracy Theory)।
স্মৃতিতে অম্লান ‘চাঁদনি’ মৃত্যু একজন শিল্পীর নশ্বর শরীরকে কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু তাঁর কাজকে নয়। শ্রীদেবী মানেই এক অনন্ত জ্যোতি, যিনি ‘মি পার্পল’ শাড়িতে বৃষ্টির নাচে কিংবা শান্ত চোখের চাহনিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। ভারতীয় সিনেমার বিবর্তনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মৃত্যু রহস্যের সমাধান হোক বা না হোক, শ্রীদেবী সবসময় থাকবেন রুপালি পর্দার সম্রাজ্ঞী হয়ে—যার বিকল্প হয়তো আর কোনোদিন আসবে না।