• জাতীয়
  • পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে

পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে

তপ্ত রাজপথের পিচঢালা রাস্তা, যেখানে ১৭ বছর ধরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রু মিশে ছিল; সেই ধূসর প্রান্তর পেরিয়ে আজ সচিবালয়ের সুউচ্চ অট্টালিকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আসীন হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতারা।

‘পিচঢালা রাজপথের সাহসী সেনানীরা কেমন আছেন ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে’ এই শিরোনামটি কেবল একটি যাত্রার বর্ণনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তির প্রতীক।

২০০৭ সালের ১/১১ পরবর্তী সংকট থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে দুঃসহ সময় অতিক্রম করেছে, তা সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল। কয়েক লাখ মামলা, হাজারো নেতাকর্মীর গুম ও নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখেও যারা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, আজ তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের অভূতপূর্ব গণরায়, যা ভূমিধস বিজয়ে রূপ নিয়েছে, মূলত রাজপথের সেই ত্যাগ ও সংগ্রামেরই ফল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সচিবালয়ের এই শীতল ছায়া কোনো প্রাপ্তি বা দয়া নয়; এটি এক বিশাল আমানত; সেই সব নেতাদের ওপর অর্পিত, যারা দেড় দশকেরও বেশি সময় ঘরবাড়ি ছেড়ে ফেরারি জীবন কাটিয়েছেন এবং জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠকেও আপন করে নিয়েছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার পলায়নের পর থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টুকু বাংলাদেশের জন্য ছিল চরম অস্থিরতার এক অধ্যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অন্তর্বর্তী সময়ে নানামুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র সক্রিয় ছিল, যাতে নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করা যায়।

৫ আগস্টের পর একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ক্ষমতা প্রলম্বিত করার যে অপচেষ্টা চলেছিল, তা প্রতিহত করা বিএনপির জন্য ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলেও দলটিকে সমানতালে লড়তে হয়েছে। নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির অনড় অবস্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ধারাবাহিক জনচাপ শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিশ্চিত করে। এই দীর্ঘ ১৮ মাসে বারবার ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে একটি ‘বিশেষ অবস্থা’ জারির চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং বিএনপির সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক কৌশলের কাছে সেই সব প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট ছিল না; এটি ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশে সজোরে চপেটাঘাত এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশের রাজনীতির গত দেড় দশকের অন্যতম পরিচিত ও সংগ্রামী মুখ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজপথে ধাওয়া খাওয়া, পুলিশের লাঠিচার্জের মুখে পড়া কিংবা দফায় দফায় কারাবরণ; বিএনপির আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা। আজ তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।

সচিবালয়ের প্রটোকল আর কর্মকর্তাদের আনাগোনার মাঝে তাকে দেখে অনেকেই পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় রাজপথে ‘ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক’ স্লোগান দেওয়া একজন নেতার জন্য মন্ত্রণালয়ের ফাইলে সই করা মানসিক ও কাঠামোগত দিক থেকে বড় পরিবর্তন। আজ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দায়িত্ব পালন করলেও, তার স্মৃতিতে হয়তো ভেসে ওঠে কেরানীগঞ্জ কারাগারের স্যাঁতসেঁতে মেঝে কিংবা পল্টন মোড়ের টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া। তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রামের এক ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তবে আন্দোলনের নেতা হিসেবে যে ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছেন, প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর তিনি নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন; সেটিই এখন দেখার বিষয়। রাজপথের সেই তেজস্বী কণ্ঠ আজ যখন ফাইলে সই করেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে; সেই কলম যেন ন্যায়ের পক্ষেই সচল থাকে।

বিএনপির এই বিশাল বিজয়ের পেছনে রয়েছে হাজারো নাম না জানা নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ। কিন্তু রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতা হলো, সবাই মন্ত্রণালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্থান পান না। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী, যারা গত ১৭ বছর বাড়িছাড়া ছিলেন, যাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারা আজও তৃণমূলের ধুলোবালিতেই পড়ে আছেন। তাদের জন্য নেই কোনো চাকচিক্যময় অফিস, নেই সরকারি প্রটোকল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তৃণমূলের কর্মীরাই ছিলেন বিএনপির প্রকৃত শক্তি। যখন কেন্দ্রীয় নেতারা কারাগারে ছিলেন, তখন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারাই আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছেন। আজ দল ক্ষমতায় আসার পর এই অবহেলিত নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা বিএনপির জন্য বড় এক পরীক্ষা। তারা কীভাবে রাষ্ট্রের কাজে যুক্ত হবেন? তাদের কি কেবল নির্বাচনের সময় ব্যবহার করা হবে, নাকি রাষ্ট্র সংস্কারের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা হবে? স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূলের এই ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন না হলে দলের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকির কারণ হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. মোজাহিদুল ইসলাম মনে করেন, দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুমের পরও বিএনপির টিকে থাকা কেবল রাজনৈতিক কৌশলের ফল নয়; বরং তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের গভীর সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ‘এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সাঁড়াশি অভিযানের মুখেও যারা দল ত্যাগ করেননি, তারাই আজ নতুন সরকারের মূল স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। রাজপথের উত্তপ্ত স্লোগান এখন নীতিনির্ধারণী ফাইলে রূপ নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাদের মূল্যায়ন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’

বিগত ১৭ বছরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ওপর যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। এই তালিকার অন্যতম নাম গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। রাজপথে তার রক্তাক্ত পাঞ্জাবি ও পুলিশের লাঠির আঘাতে মাথা ফেটে যাওয়ার দৃশ্য বহু মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর মন্ত্রিসভা গঠনে তার নাম না থাকায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে দেখা গেলে দলের ভেতরে ও বাইরে গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও তিনি বলেছেন, মন্ত্রীত্ব না পাওয়ার ক্ষোভে নয় বরং মন্ত্রী ছাড়া সামনের সারির চেয়ারে বসতে না দেওয়ার বিষয়টি তাকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলেছেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত আর মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেব না। মন্ত্রী হব না জেনেই মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। মন্ত্রী না করায় রাগ করে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছেন এমন ধারণা সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে, প্রবীণ নেত্রী সেলিমা রহমান; যিনি দীর্ঘদিন বেগম খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী হিসেবে রাজনীতি করেছেন এবং গৃহবন্দী অবস্থাতেও চেয়ারপারসনের পাশে থেকেছেন। তাকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এমনকি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়নি। জানা গেছে, জীবনের এই পর্যায়ে এসে দলের এমন সিদ্ধান্তে তিনি গভীর মানসিক আঘাত পান এবং পরবর্তীতে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এসব ঘটনা ইঙ্গিত করে, ১৭ বছরের রাজপথের লড়াইয়ের পর যখন দায়িত্ব বণ্টন বা স্বীকৃতির সময় আসে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই ত্যাগী ও প্রবীণ নেতারা উপেক্ষিত হন। ত্যাগের তুলনায় মন্ত্রিত্ব হয়তো বড় বিষয় নয়, কিন্তু সম্মান ও মূল্যায়নের অভাব একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের জন্য গভীর বেদনার কারণ হতে পারে।

বিএনপির শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতাদের বিরুদ্ধে বিগত সময়ে বিপুলসংখ্যক মামলা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ অসংখ্য নেতার নামে শত শত মামলা ছিল। মির্জা আব্বাসকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে এবং তার পরিবারের ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বারবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘ সময় নয়াপল্টনের কার্যালয়ে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন কিংবা কারাগারে কাটিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৭ বছরে এমন খুব কম শীর্ষ নেতা আছেন, যিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হননি। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মাথা ফেটে যাওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে রিজভীর দীর্ঘ অসুস্থতা; সবই ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিহ্ন। আজ যখন তাদের অনেকে মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তখন প্রশ্ন উঠছে, অতীতের সেই নির্যাতনের বিচার কীভাবে নিশ্চিত হবে। বিচার প্রক্রিয়া কি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে, নাকি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে; সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা দলীয় দাবির পাশাপাশি একটি বৃহত্তর জাতীয় প্রত্যাশা হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর আয়নাঘর তৈরি করার সাহস না পায়।

Tags: রাজপথ পিচঢালা সাহসী সেনানী ছায়াশীতল মন্ত্রণালয়ে