মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি আঘাত হানল এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ায়। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় সিউলের আর্থিক বাজারে দেখা দিয়েছে এক নজিরবিহীন ‘ট্রিপল শক’ (Triple Shock)। বুধবার (৪ মার্চ) দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার ও জ্বালানি বাজারে যে পরিমাণ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিরল। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা এবং রফতানি-নির্ভর (Export-oriented) কাঠামোর কারণেই বৈশ্বিক এই ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।
শেয়ারবাজারে ইতিহাসের বৃহত্তম ধস: ৯/১১-এর রেকর্ড ভঙ্গ
বুধবার সিউলের প্রধান স্টক মার্কেট সূচক ‘কসপি’ (KOSPI) এক অবিশ্বাস্য পতনের সাক্ষী হয়েছে। এদিন সূচকটি ১২.৬ শতাংশ বা ৬৯৮.৩৭ পয়েন্ট কমে ৫,০৯৩.৫৪ পয়েন্টে লেনদেন শেষ করে। দিনের একপর্যায়ে এটি ৫,০৫৯.৪৫ পয়েন্টে নেমে গিয়েছিল, যা ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পরবর্তী দরপতনকেও হার মানিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ পতনের রেকর্ড।
একই অবস্থা দেখা গেছে প্রযুক্তিনির্ভর ‘কসডাক’ (KOSDAQ) সূচকেও। এদিন কসডাক সূচকটি ১৪ শতাংশ ধসে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি করেছে। মাত্র দুই কার্যদিবসের ব্যবধানে সূচকটি এক হাজার পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে, যার ফলে বাজার থেকে প্রায় ৮০০ ট্রিলিয়ন উয়ন বাজার মূলধন (Market Capitalization) উধাও হয়ে গেছে।
অচলাবস্থা রুখতে ‘সার্কিট ব্রেকার’ ও ‘সাইডকার’ কার্যকর
বাজারে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ এবং অস্থিরতা সামাল দিতে কোরিয়া এক্সচেঞ্জ (KRX) একাধিকবার ‘সার্কিট ব্রেকার’ (Circuit Breaker) এবং ‘সাইডকার’ কার্যকর করতে বাধ্য হয়। লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হলেও পতন রোধ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, একই দিনে কসপি ও কসডাক উভয় বাজারে সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হওয়ার ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
ধুঁকছে স্যামসাং-হুন্দাইয়ের মতো টেক জায়ান্টরা
বিশ্বখ্যাত দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরেও ব্যাপক পতন লক্ষ্য করা গেছে। গ্লোবাল টেক জায়ান্ট (Tech Giant) স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স-এর শেয়ার দর কমেছে ১১.৭৪ শতাংশ। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স ৯.৫৮ শতাংশ এবং অটোমোবাইল জায়ান্ট হুন্দাই মোটর ১৫.৮ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে। এমনকি ব্যাটারি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এলজি এনার্জি সল্যুশন-এর শেয়ার দরও ১১ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা দেশটির শিল্প খাতে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
মুদ্রাবাজারে হাহাকার: ডলারের বিপরীতে তলানিতে উয়ন
শুধু শেয়ারবাজার নয়, মুদ্রাবাজারেও (Currency Market) নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। দক্ষিণ কোরিয়ান উয়ন মার্কিন ডলারের বিপরীতে অস্বাভাবিক দুর্বল হয়ে পড়েছে। বুধবার এক পর্যায়ে বিনিময় হার ১,৫০৫.৮ উয়ন ছাড়িয়ে যায়। ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের (Global Financial Crisis) পর এই প্রথম উয়নের মান এতটা নিচে নামল। দিন শেষে ডলারপ্রতি বিনিময় হার ১,৪৭৬.২ উয়নে দাঁড়ালেও রাতের লেনদেনে তা ফের অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক প্রভাব
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা এখন নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে মূলধন সরিয়ে নিচ্ছেন। বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের এই বহুমুখী প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।