মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়ে ষষ্ঠ দিনে পদার্পণ করেছে। গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহতের সংখ্যা কেবল বাড়ছেই না, বরং যুদ্ধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী প্রায় সবকটি দেশে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এক বীভৎস চিত্র।
ইরানে মানবিক বিপর্যয়: লক্ষ্যবস্তু যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়
চলমান এই যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’ জানিয়েছে, গত শনিবার ইরানের মিনাব এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (Missile Strike) চালানো হয়। এই একক হামলায় ১৭৫ জন নিষ্পাপ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন হামলাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা যুদ্ধের অন্যতম নৃশংস অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করছেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ১ মার্চ বেইত শেমেশ এলাকায় চালানো হামলায় ৯ জন প্রাণ হারান। এছাড়া দেশটির কয়েকশ নাগরিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, সংঘাতের ময়দানে সরাসরি জড়িত থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (Pentagon) তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৮ জন গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করলেও ওয়াশিংটন এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের আঁচ
ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণে লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ উপকণ্ঠ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭৭ জনে দাঁড়িয়েছে, আর আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০০।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে শান্ত হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় দেশগুলোতেও:
কুয়েত: ইরানি হামলায় ২ জন কুয়েতি সেনাসহ অন্তত ৪ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): দেশটি জানিয়েছে, চলমান সংঘাতে তাদের অন্তত ৩ জন নাগরিক নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
বাহরাইন: সালমান শিল্প নগরীতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ১ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন।
ওমান ও ইরাক: ওমান উপকূলে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী একটি ট্যাঙ্কারে (Oil Tanker) হামলায় ১ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ইরাকেও সংঘাতের জেরে ২ জন নিহত ও ৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক শঙ্কা
যুদ্ধের প্রভাব থিতু হতে শুরু করেছে কাতার, জর্ডানের মতো দেশগুলোতেও। কাতারে ১৬ জন এবং জর্ডানে ৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের এনার্জি সাপ্লাই চেইন (Energy Supply Chain) ও রিজিওনাল স্ট্যাবিলিটি চরম সংকটে পড়বে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিকে একটি বড় মাপের ‘হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস’ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ড্রোনের গুঞ্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের আলোয় ঢাকা। বিশ্ববিবেকের প্রশ্ন—এই ধ্বংসলীলার শেষ কোথায়?