আমাদের শরীর সচল রাখতে হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের গুরুত্ব নিয়ে আমরা সচেতন হলেও কিডনির স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়। অথচ কিডনি যখন কাজ করা কমিয়ে দেয়, তখন শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য জমতে শুরু করে। শরীর তখন ছোট ছোট সংকেতের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করার চেষ্টা করে।
কেন শুরুতে কিডনি রোগের লক্ষণ বোঝা যায় না? বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির গঠন এমন যে এটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাকি অংশ দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত লক্ষণগুলো প্রকট হয় না। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি ধরা পড়তে অনেক দেরি হয়ে যায়।
কিডনি সমস্যার সূক্ষ্ম ৪টি লক্ষণ ১. প্রস্রাবে পরিবর্তন: রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া, প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা বা বুদবুদ হওয়া এবং রঙের পরিবর্তন কিডনি সমস্যার অন্যতম সংকেত। প্রস্রাবে ফেনা হওয়ার অর্থ হলো কিডনির ছাঁকনি প্রোটিন ধরে রাখতে পারছে না, যা প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যাচ্ছে।
২. অকারণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা: কিডনি থেকে 'এরিথ্রোপয়েটিন' নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা রক্তে লোহিত কণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। কিডনি দুর্বল হয়ে পড়লে এই হরমোনের উৎপাদন কমে যায়, ফলে রক্তাল্পতা দেখা দেয় এবং শরীর ক্লান্ত লাগে।
৩. শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যাওয়া: কিডনি যখন শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও তরল বের করে দিতে পারে না, তখন চোখ বা পায়ের গোড়ালি ফুলে যেতে পারে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের নিচে ফোলাভাব দেখলে এটি অবহেলা করা উচিত নয়।
৪. উচ্চ রক্তচাপ: কিডনি শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হঠাৎ করে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া কিডনি সমস্যার সংকেত হতে পারে। আবার উচ্চ রক্তচাপের কারণেও কিডনির ক্ষতি হওয়ার একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
জরুরি পরীক্ষাগুলো কী কী? কিডনির অবস্থা জানতে চিকিৎসকরা মূলত দুটি পরীক্ষার পরামর্শ দেন। একটি হলো eGFR (রক্তের পরীক্ষা), যা কিডনির বর্জ্য পরিষ্কারের ক্ষমতা পরিমাপ করে। অন্যটি হলো Urine Albumin-to-Creatinine Ratio (প্রস্রাবের পরীক্ষা), যা প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। এ ছাড়া ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও নজরে রাখা প্রয়োজন।
কিডনি ভালো রাখার ৪ অভ্যাস কিডনি সুস্থ রাখা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর আয়ু বাড়ানো সম্ভব:
- লবণ কমান: খাবারে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার এবং প্রসেসড খাবার কিডনির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
- শারীরিক পরিশ্রম: নিয়মিত হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
- পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়মিত ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরে কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, যা কিডনির জন্য জরুরি।
- খাবারের নিয়ম: রাতে দেরি করে ভারী ও লবণাক্ত খাবার খাওয়া পরিহার করুন।
পরিশেষে, কিডনি একটি নীরব পরিশ্রমী অঙ্গ। বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে এই অঙ্গটিকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।