প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর পরিহাসের নাম এখন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। একসময়ের প্রমত্তা করতোয়া নদী আজ নামেমাত্র ‘মরা করতোয়া’। আর এই নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোতে শুষ্ক মৌসুম শুরু হতে না হতেই শুরু হয়েছে সুপেয় ও সেচের পানির তীব্র সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর (Groundwater Level) অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ টিউবওয়েলগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে, যা এই অঞ্চলের কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় ধরনের অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পানির সন্ধানে ‘পাতালযাত্রা’: ১৫ ফুট গভীরে সেচযন্ত্র উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। বর্গাচাষি মিনারুল ইসলামসহ শত শত কৃষক এখন পানির সন্ধানে আক্ষরিক অর্থেই মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ছেন। সমতলে সাধারণ ‘শ্যালো মেশিন’ (Shallow Machine) চালিয়ে আর পানি উঠছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের প্রায় ১৫ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে মাটির গভীরে পাম্প বসাতে হচ্ছে।
এই পদ্ধতি কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং ব্যয়বহুলও বটে। কৃষকদের দাবি, আগে যে জমিতে সেচ দিতে ৫ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে পানির নিম্নমুখী স্তরের কারণে ১০ থেকে ১২ লিটার তেল খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি ‘ইরিগেশন কস্ট’ (Irrigation Cost) মেটাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে প্রান্তিক কৃষকদের।
তৃষ্ণার্ত ছয় ইউনিয়ন: সংকটে লাখ লাখ মানুষ পানির এই হাহাকার কেবল ফসলের মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, পৌঁছে গেছে মানুষের অন্দরমহলেও। গোবিন্দগঞ্জের কাটাবাড়ি, কামদিয়া, শাখাহার, রাজাহার, গুমানীগঞ্জ ও সাপমারা—এই ছয়টি ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষ এখন এক ফোঁটা সুপেয় পানির জন্য মরিয়া। সাধারণ টিউবওয়েল থেকে পানি আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য এখন ঝুঁকির মুখে। যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তারা কয়েক লাখ টাকা খরচ করে ‘সাবমার্সিবল পাম্প’ (Submersible Pump) বসাচ্ছেন। কিন্তু ভূমিহীন ও দরিদ্র পরিবারগুলো এখন মাইলের পর মাইল হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে।
নদী যখন ধুধু বালুচর: সংকটের মূলে পলি ও অপরিকল্পিত সেচ গোবিন্দগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী এখন খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। নদীর বুকে পানির বদলে এখন ধুধু বালুচর, যেখানে চলছে রবি শস্যের চাষাবাদ। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার সেচযন্ত্র স্থাপন করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়াই এই জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) নেতিবাচক প্রভাব। ওয়াটার টেবিল (Water Table) আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় ভূ-প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দাবি পরিস্থিতি সামাল দিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গত ৫ বছরে সরকারি অর্থায়নে ৭৮০টি টিউবওয়েল স্থাপন করেছে। অন্যদিকে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৩১টি পুকুর ও তিন কিলোমিটার খাল খনন করেছে। তবে এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সেচযন্ত্র থেকে অন্যটির নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে (Rainwater Harvesting) সাধারণ মানুষকে সচেতন করা না গেলে এই মরুপ্রক্রিয়া আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে করতোয়া নদী পুনরায় খনন এবং পানির অপচয় রোধে কার্যকর ও টেকসই ‘ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ (Water Management) পরিকল্পনা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।