মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন এক চরম বিস্ফোরণোন্মুখ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর গর্ব ও প্রযুক্তির বিস্ময় হিসেবে পরিচিত একটি ‘এফ-৩৫’ (F-35) যুদ্ধবিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের এই অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের (5th Generation) স্টিলথ ফাইটার জেটটি ইরানি গোলার আঘাতে কার্যত অকেজো হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ (Emergency Landing) করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন প্রযুক্তির অহংকার ও ‘ইমারজেন্সি ল্যান্ডিং’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) সরাসরি হামলায় এই যুদ্ধবিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘যুদ্ধ অভিযান’ পরিচালনা করার সময় বিমানটি আক্রান্ত হয়। এটি মার্কিন সামরিক সক্ষমতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হকিন্স আরও যোগ করেন, ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতি সত্ত্বেও পাইলট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিমানটিকে একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে ল্যান্ড করাতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে বিমানটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে তদন্ত চালানো হচ্ছে। সৌভাগ্যবশত পাইলটের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।’
প্রথম সরাসরি সংঘাত: পর্দার আড়ালে নেই আর ইরান
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের সরাসরি হামলার শিকার হলো। উল্লেখ্য, এফ-৩৫ বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী আকাশযানগুলোর একটি, যা রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম (Stealth Technology)। এই বিমানে আঘাত হানার মাধ্যমে ইরান কার্যত ওয়াশিংটনকে এক কঠোর সতর্কবার্তা পাঠাল।
ইসরায়েলের জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনায় জোড়া আঘাত
কেবল মার্কিন বিমান নয়, ইরানের হামলার মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর কিরিয়াত শেমোনায় রকেট হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে হাইফা এলাকায় অবস্থিত ‘বাজান গ্রুপ’ (BAZAN Group) তেল শোধনাগারকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা অস্বীকার করেছে, তবে এই হামলা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা: কাতার, সৌদি ও কুয়েতে বিপর্যয়
ইরানের এই সামরিক কৌশলের বড় অংশ জুড়ে ছিল আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো (Energy Infrastructure)। কাতারের রাস লাফান এলএনজি (LNG) স্থাপনায় হামলার ফলে দেশটির গ্যাস রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে কাতার বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া সৌদি আরবের ইয়ানবু অঞ্চলে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং কুয়েতের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কোম্পানির স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করেছে, তবুও জ্বালানি হাবগুলোতে এমন ধারাবাহিক হামলা বৈশ্বিক তেলের বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার (Regional Stability) জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আগামীর সংকেত
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বহুমুখী হামলা এটিই প্রমাণ করে যে, তারা কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই। অত্যাধুনিক মার্কিন ‘স্মার্ট ওয়েপন’ ও যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে ইরানের এই সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে বড় ধরনের ‘পাল্টা হামলা প্যাকেজ’ চালুর গুঞ্জন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, এই পাল্টাপাল্টি হামলা যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে।