পবিত্র ঈদুল ফিতরের মহিমান্বিত ক্ষণে উত্তর জনপদের কুড়িগ্রামে এখন উৎসবের আমেজ। সারা দেশের মতো এই সীমান্ত জেলাতেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে। তবে ঘরোয়া আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাধারণ মানুষের বিনোদনের একমাত্র গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রমত্তা ধরলা নদীর পাড় ও ঐতিহ্যবাহী ধরলা সেতু। শনিবার (২১ মার্চ) দুপুর গড়াতেই ধরলা পাড়ে নামে মানুষের ঢল, যা সন্ধ্যার পর রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।
নীল জলরাশি আর সেতুর মিলনমেলা
কুড়িগ্রাম শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ধরলা সেতু এখন জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘Tourist Spot’। ঈদের নামাজের পর থেকেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ ছোট ছোট যানবাহন ও মোটরসাইকেলে করে এখানে জড়ো হতে থাকেন। নদীর তীরের প্রতিরক্ষা বাঁধ এবং সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নির্মল বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন সব বয়সী দর্শনার্থী। বিশেষ করে যারা কর্মস্থল থেকে ‘নাড়ির টানে’ বাড়িতে ঈদ করতে এসেছেন, তাদের জন্য এটি যেন এক আত্মিক প্রশান্তি।
ডিজিটাল উচ্ছ্বাস ও নাগরিক স্বস্তি
বর্তমান প্রজন্মের কাছে উৎসব মানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তগুলো শেয়ার করা। ধরলা পাড়ে আসা তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে দেখা গেছে ‘Selfie’ তোলার ধুম। কেউবা ভিডিও কলে দূর-দূরান্তে থাকা প্রিয়জনকে দেখাচ্ছেন নদীর রূপ। পরিবার নিয়ে আসা জোসনা বেগম (৫০) জানান, “প্রতিবছরই এখানে আসি। তবে এবার সেতুর ওপর ‘Divider’ দেওয়ায় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় চলাফেরা করতে অনেক সুবিধা হচ্ছে। এটি আমাদের বিনোদনের সেরা জায়গা।” কিশোর জাহিদ হোসেনের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। সে জানায়, মায়ের সাথে এসে ফুসকা খাওয়া আর নদীর পাড়ে আড্ডা দেওয়াটাই তার ঈদের সেরা পাওনা।
নিরাপত্তায় নিশ্ছিদ্র প্রটোকল ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ গ্রহণ করেছে ‘Security Protocol’। ধরলা ব্রিজে দীর্ঘ যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগ প্রথমবারের মতো ‘One-way System’ চালু করেছে। অর্থাৎ, যানবাহনগুলো একটি নির্দিষ্ট দিক দিয়ে প্রবেশ করে অন্য দিক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন জননিরাপত্তা রক্ষায়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোটরসাইকেল আরোহীদের গতিরোধ ও তল্লাশি কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের কঠোর বার্তা
কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি এই উৎসবমুখর পরিবেশ নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ঈদের ছুটিতে ধরলা পাড়ে প্রতি বছরই বিপুল জনসমাগম ঘটে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পুরো এলাকা আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়ালে তাকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
স্থানীয়রা জানান, ঈদের এই মিলনমেলা কেবল একদিনের জন্য নয়, বরং আগামী চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত এই ভিড় অব্যাহত থাকবে। কুড়িগ্রামের স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও এই পর্যটন কেন্দ্রটি ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।