পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বীপ বিরোধ নিয়ে এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (UAE) নজিরবিহীন ও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিল ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, বিতর্কিত দ্বীপগুলোকে কেন্দ্র করে আমিরাতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। সেক্ষেত্রে আমিরাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ‘রাস আল খাইমাহ’ সরাসরি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু বা Target হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অগ্নিগর্ভ পারস্য উপসাগর: হুমকির নেপথ্যে কী?
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন দ্বীপ— আবু মুসা (Abu Musa), বৃহত্তর তুনব (Greater Tunb) এবং ক্ষুদ্রতর তুনব। এই দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে বিরোধ চলছে। আমিরাত দাবি করে আসছে, এই দ্বীপগুলো তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, ১৯৭১ সাল থেকেই দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তেহরান একে তাদের ‘সার্বভৌম ভূখণ্ড’ হিসেবে গণ্য করে।
শনিবার (২১ মার্চ) ইরান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি কোনো শহরের নাম উল্লেখ করে এমন হুমকি ‘Military Escalation’ বা সামরিক উত্তেজনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
টার্গেটে ‘রাস আল খাইমাহ’: সরাসরি হামলার আল্টিমেটাম
ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের বিবৃতিতে সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে বলেছে, “আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করছি যে, পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের আবু মুসা এবং বৃহত্তর তুনব দ্বীপপুঞ্জের বিরুদ্ধে যদি তাদের ভূখণ্ড থেকে কোনো ধরনের আগ্রাসন (Aggression) চালানো হয় বা অন্য কোনো শক্তিকে আমিরাতের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়, তবে ইরানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী রাস আল খাইমাহ-তে ভয়াবহ হামলা চালাবে।”
এই হুমকির মাধ্যমে তেহরান মূলত একটি ‘Red Line’ বা চরম সীমা অঙ্কন করে দিল। বিশেষ করে ওই অঞ্চলে পশ্চিমা শক্তির উপস্থিতি এবং আমিরাতের সাথে তাদের সামরিক সখ্যতাকে কেন্দ্র করেই ইরানের এই মারমুখী অবস্থান বলে মনে করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব ও প্রভাব
বিতর্কিত এই দ্বীপগুলোর অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালীর’ (Strait of Hormuz) একেবারে প্রবেশদ্বারে। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের একটি বিশাল অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য সামরিক অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে তাদের ‘Maritime Dominance’ বা সামুদ্রিক আধিপত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট। আজকের এই হুমকি মূলত তাদের ‘Strategic Deterrence’ বা কৌশলগত প্রতিরোধেরই অংশ, যা সরাসরি দুবাই বা আবুধাবির মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তার জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ।
ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক সুর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আমিরাত সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে সরব হয়েছে, যা তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। ইরানের এই ‘রাস আল খাইমাহ’ কার্ড মূলত আমিরাতকে চাপে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।
তবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের এই উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো না হলে, যেকোনো মুহূর্তের ছোট একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে।