বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বস্তিগুলোতে বেড়ে উঠছে হাজার হাজার শিশু, যাদের শৈশব আবদ্ধ অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও বঞ্চনার এক অদৃশ্য বেড়াজালে। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই শিশুদের বড় একটি অংশ প্রতিদিনই লড়াই করছে নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অভাবে।
চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকা—বায়েজিদ, আকবরশাহ, পাহাড়তলী, হালিশহর ও কর্ণফুলী সংলগ্ন বস্তিগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট ছোট টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে একাধিক পরিবার। সংকীর্ণ গলিপথ, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও দূষিত পানির কারণে শিশুরা নিয়মিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্তির পরিবেশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশুদ্ধ পানির অভাব, উন্মুক্ত নর্দমা ও অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগসহ নানা সংক্রামক রোগে ভুগছে শিশুরা। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় এসব রোগ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।
একজন অভিভাবক জানান, “আমরা নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পারি না, বাচ্চাদের চিকিৎসা করানো তো আরও কঠিন। অসুখ হলে ওষুধের বদলে ঘরোয়া উপায়েই চলতে হয়।”
শিক্ষাবঞ্চনা ও শিশুশ্রম বস্তির শিশুদের একটি বড় অংশ স্কুলমুখী নয়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়ছে শ্রমে—কেউ গাড়ির গ্যারেজে কাজ করছে, কেউ হোটেল-রেস্টুরেন্টে, আবার কেউবা রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি বা ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এভাবে শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুরা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা সহজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বস্তি এলাকার শিশুদের জীবন খুবই কঠিন এবং অনেক সময় বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। এদের মধ্যে উচ্চ হারে অপুষ্টি, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, বাল্য বিয়ে, শিশু শ্রম ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।
২০১৬ সালে পরিচালিত ‘চাইল্ড ওয়েল বিং সার্ভে’ এবং এমআইসিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বস্তির শিশুদের অবস্থা গ্রামের শিশুদের চেয়ে অনেক খারাপ। বস্তিগুলোতে অবকাঠামো ও সেবার ঘাটতি রয়েছে এবং সব সময় সেখানে উচ্ছেদ আতঙ্ক থকে। কেননা বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে সাধারণত নিচু এলাকায়। বস্তিতে বসবাসকারী শহরের এই দরিদ্র মানুষগুলো সব সময় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
বস্তিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই এক কক্ষে বসবাস করে।
বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বস্তির শিশুরা নিয়মিত যে খাবার খায়, তার ৮৬ শতাংশে বহু ধরনের ক্ষতিকর ছত্রাক থাকে। এ কারণে বস্তির শিশুরা বারবার ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়। এ জন্য শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
নগর কেন্দ্রীক বস্তিকে কেন্দ্র করে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ নানা মাদকদ্রব্য বিক্রি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্তিবাসী। মাদক বিক্রেতা বাবা-মায়ের পাল্লায় পড়ে স্কুলগামী শিশুরাও এ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি বাবা-মা, সন্তান একসঙ্গে মাদক গ্রহণ করে বলেও বস্তিবাসীরা জানান। মাদকসেবী শিশু-কিশোরদের পাল্লায় পড়ে অন্য শিশুরাও আসক্ত হয়ে পড়ছে। এভাবে একসময় বিদ্যালয়ে যাওয়া ছেড়ে দেয় শিশুরা। অপরাধ ও মাদকের ঝুঁকি স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু বস্তি এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক চক্রের প্রভাব বাড়ছে। পর্যাপ্ত নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু অল্প বয়সেই মাদক ও অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে তাদের জীবন যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি সমাজেও বাড়ছে অস্থিরতা।
একজন সমাজকর্মী বলেন, “এই শিশুদের যদি এখনই সঠিক পথে না আনা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা সমাজের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”
নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতন বস্তির শিশুরা প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়—শারীরিক, মানসিক এমনকি যৌন নির্যাতনও। সংকীর্ণ বাসস্থান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাবে তারা নিরাপদ পরিবেশ পায় না। অনেক ঘটনা সামাজিক লজ্জা ও ভয়ভীতির কারণে প্রকাশও পায় না।