সৌদি আরবে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশী নারী আয়েশা খাতুনের (৩০) লাশ দাফন এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাঁর মায়ের স্বাক্ষর জাল করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্বামী মোঃ শরিফুল ইসলাম ফারুকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করছে, আয়েশার মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র এবং বীমার অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্য রয়েছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ধলারপাড়া গ্রামের মোছাঃ রানু বেগম গত ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে এই মর্মে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে পীরগঞ্জের এনায়েতপুর গ্রামের মোঃ আইয়ুব আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম ফারুকের সাথে আয়েশা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই ফারুক ও তার পরিবার আয়েশার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল বলে দাবি করেন আয়েশার মা রানু বেগম। নির্যাতনের মুখে আয়েশা বাবার বাড়িতে চলে এলেও পরে স্বামী ফারুকের প্ররোচনায় গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান।
আয়েশার মা রানু বেগম জানান, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে আয়েশার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে গত ৩ মার্চ ফারুকের পরিবার থেকে জানানো হয় যে, আয়েশা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আয়েশার মরদেহ দাফন এবং প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ থেকে একটি ‘ওয়ারিশান অনুমতি পত্র’ (Power of Attorney) প্রয়োজন ছিল।মৃত আয়শার মা রানু বেগমের দাবি, তিনি বা তার পরিবারের কেউ কোনো অনুমতি পত্রে স্বাক্ষর করেননি। অভিযোগ উঠেছে, ফারুক বাংলাদেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে রানু বেগমের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সৌদি আরবে জমা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার মনে করছে, আয়েশার মৃত্যুর পেছনে ফারুকের হাত থাকতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের ট্রাফিক পুলিশ রিপোর্টে স্বামীকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করার তথ্য আসার পর পরিবারের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। রানু বেগম বলেন, "আমার মেয়ের লাশ ফেরত আনা বা দাফনের ব্যাপারে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। আমার স্বাক্ষর জাল করে সব কাজ করা হয়েছে। আমি আমার মেয়ের মৃত্যুর সঠিক বিচার এবং এই জালিয়াতির সাথে জড়িত ফারুকসহ সবার শাস্তি চাই।
ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ১১ নং পাঁচগাছী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যানের বক্তব্য। তিনি সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, আয়েশা খাতুনের ওয়ারিশান ও দাফন সংক্রান্ত নথিপত্রে তিনি স্বাক্ষর করেছেন, তবে তা ছিল প্রতারণামূলক।
প্যানেল চেয়ারম্যান বলেন,"ফারুকের পরিবার অত্যন্ত চাতুরতার সাথে তথ্য গোপন করে আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছে। তারা আমাকে প্রকৃত সত্য জানায়নি।"
তবে জালিয়াতির এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ফারুকের বাবা মোঃ আইয়ুব আলী। তিনি দাবি করেন, "তারা কোনো কাগজ বা স্বাক্ষর জাল করেননি।"
সৌদি আরব থেকে মুঠোফোনে অভিযুক্ত স্বামী শরিফুল ইসলাম ফারুক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, আয়েশা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এবং এটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র।
লাশ দেশে পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন,আয়েশার পরিবারের অসহযোগিতার কারণেই লাশটি দেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি।"
ইতিমধ্যেই পীরগঞ্জ থানায় এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসেও বিচার চেয়ে আবেদন করেছেন মৃত আয়েশার মা। আবেদনে আয়েশা খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।