আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি। তবে এই মেগা ইভেন্টকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের ক্রিকেটাঙ্গন এখন চরমভাবে দ্বিধাবিভক্ত। বর্তমান মহসিন নাকভি নেতৃত্বাধীন বোর্ড টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের পক্ষে থাকলেও, দেশটির সাবেক ক্রিকেট কর্তাদের একাংশ মনে করছেন ভিন্ন কথা। বিশেষ করে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ দল ভারত সফর থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর এবার সরাসরি বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিয়েছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সাবেক চেয়ারম্যান খালিদ মাহমুদ।
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান: এক অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এআরওয়াই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিসিবির সাবেক প্রধান খালিদ মাহমুদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাকিস্তানেরও উচিত এই বিশ্বকাপ বর্জন করা। উল্লেখ্য, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে আইসিসি তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করে।
খালিদ মাহমুদের মতে, "যেখানে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় এবং জীবন ঝুঁকির মুখে থাকে, সেখানে খেলতে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।" তিনি মনে করেন, আইসিসি এবং বিসিসিআই-এর চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশের এই নৈতিক অবস্থানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানো।
আইসিসির ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ ও 'পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স'
১৯৯৮-৯৯ মেয়াদে পিসিবি প্রধানের দায়িত্ব পালন করা খালিদ মাহমুদ বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, আইসিসি এখন পুরোপুরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ একজন ভারতীয় এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আধিপত্য স্পষ্ট।
তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, "বিশ্বের অন্যান্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো ভারতের দাস বা কোনো করদ রাজ্য নয়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশগুলো এখন ক্রিকেটের মানের চেয়ে 'Broadcasting Rights' এবং 'Revenue Share'-এর মতো আর্থিক স্বার্থ দ্বারা বেশি পরিচালিত হচ্ছে।"
লাহোর হামলার স্মৃতি ও আইসিসির 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড'
সাক্ষাৎকারে ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন মাহমুদ। তিনি মনে করিয়ে দেন, ওই ঘটনার পর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ দীর্ঘ সময় পাকিস্তান সফর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তখন আইসিসি পাকিস্তানের 'Security Protocol' বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ভরসা না রেখে বরং সফরকারী দেশগুলোর পক্ষ নিয়েছিল।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, "তখন কি আইসিসি পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল? তারা কি কোনো বড় দলকে পাকিস্তানে পাঠাতে বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেছিল? যদি তখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে এখন কেন ভারতের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে?" মাহমুদের মতে, আইসিসির এই 'Double Standard' বা দ্বিমুখী নীতি ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে।
আর্থিক ক্ষতি নাকি জাতীয় মর্যাদা: পিসিবির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তান যদি শেষ মুহূর্তে এই 'Mega Event' থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়, তবে পিসিবিকে আইনি জটিলতা এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক ও ক্রীড়াগত ক্ষতির (Financial and Sporting Loss) মুখে পড়তে হতে পারে। আইসিসির অন্দরমহলে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে অনেকে 'Strategic Pressure' বা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখলেও, খালিদ মাহমুদ মনে করেন এটি আত্মমর্যাদার লড়াই।
তিনি পিসিবিকে পরামর্শ দিয়েছেন, আইসিসির একটি জরুরি সভা (Emergency Meeting) ডাকার জন্য জোরালো দাবি জানাতে এবং সেখানে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার ঘোর বিরোধিতা করে তিনি দেশপ্রেম ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ২ ফেব্রুয়ারির সিদ্ধান্ত কেবল পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ঐক্য ও আইসিসির নিরপেক্ষতা প্রমাণের এক বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।