• ব্যবসায়
  • সারের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: বর্ধিত দামে দিশেহারা কৃষক, মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের

সারের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: বর্ধিত দামে দিশেহারা কৃষক, মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
সারের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: বর্ধিত দামে দিশেহারা কৃষক, মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের

বিনা রসিদে সার বিক্রি ও কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে ডিলারদের কারসাজি; রবি মৌসুমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কঠোর তদারকি ও সমন্বিত নীতিমালার দাবি।

দেশের কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত কৃষকরা এখন সারের বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে চরম দিশেহারা। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে প্রতি কেজি সারে অন্তত ২ থেকে ৩ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে প্রান্তিক চাষিদের। রবি মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফালোভী ডিলার চক্রের দৌরাত্ম্যে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চাষাবাদ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সারের এই দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষি পণ্যের ‘Production Cost’ বা উৎপাদন খরচ লাফিয়ে বাড়বে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে জাতীয় ‘Inflation’ বা মূল্যস্ফীতির ওপর।

মাঠপর্যায়ে হাহাকার: নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা নেই

সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি টিএসপি (TSP) ২৭ টাকা, এমওপি (MOP) ২০ টাকা এবং ডিএপি (DAP) ২১ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডিলারদের কাছে সার না পেয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন, যেখানে কোনো রসিদ ছাড়াই চড়া দামে সার বিক্রি হচ্ছে।

কৃষক দেলোয়ার হোসেনের ক্ষোভভরা মন্তব্য, "ডিলার পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও আমাদের বলা হচ্ছে সার নেই। অথচ পেছনের দরজা দিয়ে সেই সার চলে যাচ্ছে খুচরা দোকানে। আমরা ডিলারের কাছে গেলে রসিদ পাই না, আবার খুচরা দোকানে বেশি দাম দিয়েও কোনো প্রমাণ হাতে থাকে না। এভাবে চললে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবে।"

রসিদবিহীন বাণিজ্য ও ডিলার-খুচরা সিন্ডিকেট

অভিযোগ উঠেছে, সারের ‘Supply Chain’ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় একশ্রেণির ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ মজুত বা ‘Hoarding’ করে সংকট তৈরি করছেন। তারা খুচরা ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশ করে সার সরিয়ে ফেলছেন, যাতে বেশি মুনাফায় বিক্রি করা যায়। ডিলারদের দাবি, সরকার প্রদত্ত কমিশন দিয়ে পরিবহন ও ড্যামেজ খরচ মেটানো সম্ভব নয়, ফলে তারা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই যুক্তিকে অজুহাত হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ‘Logistics’ বা পরিবহন খরচ সামাল দিতে কৃষকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

চাহিদা ও আমদানির সমীকরণ: রবি মৌসুমের চ্যালেঞ্জ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৯ লাখ টন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ সারের প্রয়োজন হয়। এই উচ্চ চাহিদাকে পুঁজি করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে সিন্ডিকেট। ‘Bulk Carrier’ বা মাদার ভেসেল থেকে সার খালাসে বিলম্ব এবং পরিবহন ঠিকাদারদের কারসাজি অনেক সময় কৃত্রিম সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, সারের দাম বাড়লে কেবল কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর। তিনি বলেন, “যখন তৃণমূল পর্যায়ে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়, তখন বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। তাই এখনই মাঠপর্যায়ে কঠোর ‘Monitoring’ বা তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।”

সমাধানে আসছে সমন্বিত নীতিমালা ও ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট

সংকট নিরসনে বিসিআইসি (BCIC) ও বিএডিসির (BADC) পৃথক ডিলার নীতিমালাকে একীভূত করে একটি ‘Integrated Policy’ বা সমন্বিত নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। লক্ষ্য হলো, ডিলার ছাড়া খুচরা পর্যায়ে সারের লাগামহীন বিক্রি বন্ধ করা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রতিটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডে তিনজন করে ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকদের আর মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে যেতে না হয়। এছাড়া সারের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় ‘Digital Management’ বা ডিজিটাল তদারকি চালুর কথা ভাবছে সরকার, যাতে অবৈধ মজুতদারদের চিহ্নিত করা সহজ হয়।

কৃষকদের প্রত্যাশা, আসন্ন নতুন সরকার তাদের এই সংকট থেকে মুক্তি দেবে এবং জেলাভিত্তিক বিশেষ সার বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসাধু ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সারের বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত রাখা কেবল কৃষকের দাবি নয়, বরং দেশের ‘Food Security’ বা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত।

Tags: food security agriculture news market syndicate fertilizer price bangladesh agriculture farmers crisis inflation risk fertilizer shortage crop production dealer monitoring