আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২ হাজার ৮৯৬ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক।
দেশে এবারই প্রথমবারের মতো মোট রপ্তানি আয় সংকুচিত হয়েছে, অর্থাৎ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
এর আগে রপ্তানি আয় কমলেও তা প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় নিচে নেমে এসেছে। দেশে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের দমবন্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ অবস্থায় রপ্তানি আয়ের এই চিত্র পূর্বনির্ধারিত ছিল বলেই মনে করছেন উদ্যোক্তা নেতারা।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগামী জুনের আগে এই অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। নতুন সরকার আসবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির নীতি নির্ধারণ করবে, তারপর ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তার আগে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার গঠন হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণেই দেশের মোট রপ্তানি আয় সংকুচিত হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-জানুয়ারি সাত মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ২৯৮ কোটি ২ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ২ হাজার ৩৫৫ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার ডলার। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আয় সংকোচন হয়েছে প্রায় দেড় শতাংশ। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের দুই উপখাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হওয়া নিট পোশাকে রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ। একক মাস হিসেবে জানুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
জানুয়ারি মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৬১ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। আগের বছরের জানুয়ারি মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি আয় কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী মাসগুলোতে একনাগাড়ে রপ্তানি কমেছে। বিষয়টি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর বহির্বিশ্বে কোথাও রপ্তানি খাত স্বাভাবিকভাবে চলছে না। ক্রেতাদের কার্যাদেশ, সময় ও পরিমাণ—সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। দেশে ও বিদেশে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের সুদহারসহ সবকিছুতেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। সর্বোপরি বিশ্বজুড়ে চাহিদা কমে গেছে।
এই বাস্তবতায় দাম কমানোর জন্য ক্রেতাদের চাপ রয়েছে। সে কারণেই রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমে মোট রপ্তানি আয়ে সংকোচন দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের ব্যাকওয়ার্ড লিংকে যেসব দেশ ভালো অবস্থানে আছে, তারা উৎপাদন খরচ কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে পারছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধি ও নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।
তবে একক মাস হিসেবে জানুয়ারি মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি খুব একটা কম হয়নি। গত বছরের জানুয়ারি মাসে রপ্তানি তুলনামূলক বেশি হয়েছিল। সে কারণে এ বছরের জানুয়ারির রপ্তানি কিছুটা কম মনে হচ্ছে। বাস্তবে একক মাস হিসেবে জানুয়ারির রপ্তানি আয় খুব একটা খারাপ নয়। জানুয়ারির এই ধারা যদি আগামী মাসগুলোতেও ধরে রাখা যায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হবে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
সাত মাসে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৬০ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগের বছরের জুলাই-জানুয়ারি সাত মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬৭ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে কৃষি পণ্য রপ্তানিতেও আয় কমেছে ৯৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
প্রধান দুই খাতের রপ্তানি কমলেও কিছুটা বেড়েছে অন্য দুই রপ্তানি খাত—পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইল। এ দুটি খাতে যথাক্রমে ১২ শতাংশ ও ৫ শতাংশ রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলানিউজকে বলেন, ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি কমে যাচ্ছে। বাণিজ্য পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকার এই সময়ে আমি আগেই মন্তব্য করেছিলাম—রপ্তানি বাড়বে না, সেটাই এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যে কার্যাদেশ রয়েছে, সেটিই আগামী মাসগুলোর রপ্তানি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী জুন পর্যন্ত এমন অবস্থা চলতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর বোঝা যাবে রপ্তানি বাড়বে কি না। বিষয়টি পুরোপুরি নতুন সরকারের নীতির ওপর নির্ভর করবে।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, কার্যাদেশ কমে যাওয়া ও রপ্তানি আয় হ্রাসের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বহু শ্রমিক বেকার হয়েছেন। যারা এখনো কারখানা চালু রেখেছেন, তারাও আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছেন। পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। যারা অর্ধেক চালু রেখেছেন, তাদের জন্যও শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, আমার নিজের অবস্থাও একই। এভাবে হয়তো বেশিদিন কারখানা চালিয়ে রাখা সম্ভব হবে না, বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারি। এভাবেই একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে চুক্তি করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারে নতুন করে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হলো বলে মন্তব্য করেন এই উদ্যোক্তা নেতা।
তিনি বলেন, এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ভিয়েতনাম ও চীন। এখন নতুন করে ভারত যুক্ত হবে। চীনের মতো নিজস্ব কাঁচামাল সুবিধাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া দেশ হিসেবে ভারত অল্প সময়েই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, রপ্তানি খাতের জন্য যেসব সুবিধা ছিল, সেগুলোর অনেকগুলো পুরোপুরি বা আংশিকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ধাপে ধাপে কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট স্কিম নামে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল ছিল, যেখান থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যেত—সেটিও গত এপ্রিল থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে ব্যাংকের সুদহার বেশি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে, নতুন শ্রম আইনে ২০ জনেই ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে—এসব কারণে তৈরি পোশাক খাতে ঝুঁকি বেড়েছে। এর ফল হিসেবে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ করে সরে যাচ্ছেন।