কলকাতার টলিউড ইন্ডাস্ট্রির (Tollywood Industry) অন্দরে টেকনিশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের (Anirban Bhattacharya) স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক নতুন এবং জটিল মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সংঘাত মেটাতে এবং অনির্বাণের ওপর জারি থাকা তথাকথিত ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’ (Unofficial Ban) কাটাতে সম্প্রতি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সুপারস্টার দেব (Dev)। সহকর্মী ও অগ্রজ হিসেবে তিনি প্রকাশ্যেই হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ক্ষমা প্রার্থনা কি আদতে সমস্যার সমাধান করল, নাকি বিতর্কের আগুনে নতুন ঘি ঢালল? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অনির্বাণের কড়া প্রতিক্রিয়া টলিউডের ক্ষমতার অলিন্দে নতুন করে কম্পন সৃষ্টি করেছে।
দেব-এর সেই আরজি ও প্রেক্ষাপট
গত বছরের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে টেকনিশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে অনির্বাণের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। এরপর থেকেই ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়, যা কার্যত তাঁর কাজের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক স্ক্রিনিং কমিটির (Screening Committee) বৈঠক শেষে দেব সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখার অনুরোধ জানান। দেব বলেছিলেন, “অনির্বাণ অত্যন্ত প্রতিভাবান অভিনেতা, ওকে কাজ করতে দেওয়া হোক। ওর হয়ে যদি ক্ষমা চাইতে হয়, তবে আমিই চেয়ে নিচ্ছি।” দেবের এই উদারতা টলিউডের একাংশের প্রশংসা কুড়ালেও অনির্বাণ নিজে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।
‘ক্ষমা নয়, যুক্তিতে বিশ্বাসী’ অনির্বাণ
দেবের এই পদক্ষেপের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই অনির্বাণ জানিয়েছেন, বড় ভাই বা সহকর্মীদের এই স্নেহকে তিনি সম্মান করেন। কিন্তু ‘ক্ষমা’ শব্দটিতে তাঁর ঘোর আপত্তি। অনির্বাণের সাফ কথা, “দেবের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। শুধু দেব নন, বুম্বাদা (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) ও রাজদাও (রাজ চক্রবর্তী) একইভাবে আমার জন্য সওয়াল করেছেন। তাঁদের প্রতি আমার অশেষ শ্রদ্ধা রয়েছে। তাঁরা যা বলছেন, তা আমার প্রতি তাঁদের স্নেহ থেকেই বলছেন। তবে একটাই কথা স্পষ্ট করতে চাই, দয়া করে আমার হয়ে কেউ ক্ষমা চাইবেন না।”
অন্যায়ের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন ও অনমনীয় অবস্থান
অনির্বাণের এই পালটা জবাবের পেছনে কাজ করছে তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিগত দর্শন ও পেশাদারিত্ব (Professionalism)। তাঁর মতে, ক্ষমা তখনই চাওয়া উচিত যখন কেউ সত্যিই কোনো ভুল বা অন্যায় করেন। অনির্বাণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় বলেন, “আমি পৃথিবীতে অনেক মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছি, কিন্তু তখনই চেয়েছি যখন বুঝেছি সেখানে আমার অন্যায় আছে। অন্যায় করলে ক্ষমা চাইতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। কিন্তু আমাকে আগে বুঝিয়ে দিতে হবে আমার ঠিক কোন কাজটি অন্যায় ছিল?”
তিনি আরও যোগ করেন যে, ফেডারেশনের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলোচনা (Dialogue) হতে পারে এবং তিনি নিজেও সেই আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী। কিন্তু অপরাধবোধ ছাড়া ‘ক্ষমা’ চাওয়ার সংস্কৃতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। অনির্বাণের এই অবস্থান টলিউডে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতার সমীকরণে একজন শিল্পী কি তাঁর আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েই টিকে থাকবেন, নাকি যুক্তির পথেই হাঁটবেন?
ভবিষ্যৎ ও ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি
অনির্বাণ ভট্টাচার্যের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর ফেডারেশন বা দেবের পক্ষ থেকে নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে টলিউড বোদ্ধাদের মতে, অনির্বাণের এই ‘প্রিন্সিপলড স্ট্যান্ড’ বা নীতিগত অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ইন্ডাস্ট্রির কার্যপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। যেখানে প্রায়শই বড় স্টারেরা মধ্যস্থতা করে বিবাদ মেটান, সেখানে অনির্বাণের এই ‘ন্যায্যতা’র দাবি নিঃসন্দেহে এক সাহসী পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, মাস্কেট অফ আর্ট ও পাওয়ার পলিটিক্সের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।