ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় গোয়েন্দা পুলিশ (DB) পরিচয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েছে পাঁচজন প্রতারক। ডিবি পুলিশের জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডক্যাপ এবং ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আসছিল এই চক্রটি। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে এক প্রেস রিলিজের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
অভিযানের নামে চাঁদাবাজির ছক পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের রঘুনাথপুর মধ্যপাড়া এলাকায় এক বিশেষ ‘অপারেশন’ (Operation) শুরু করে এই প্রতারক চক্র। ডিবি পুলিশের পোশাক পরে তারা ওই এলাকার কামাল ও হারুন নামে দুই ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে নগদ ৬ হাজার টাকা দাবি করে এবং টাকা পেয়ে ছেড়ে দেয়। ডিবি পুলিশ কেন টাকা নিয়ে আসামি ছেড়ে দিচ্ছে—এমন সন্দেহে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের ঘেরাও করেন। এ সময় চক্রের তিন সদস্যকে ধরে ফেললেও অন্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে তাদের গ্রেফতার করে এবং পরবর্তী অভিযানে আরও দুই সদস্যকে পাকড়াও করে।
জব্দ করা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত জালিয়াতি এই প্রতারক চক্রটি কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের কাছে ছিল প্রযুক্তিগত জালিয়াতির আধুনিক সরঞ্জাম। তল্লাশিকালে তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে:
দুটি স্টিলের হাতকড়া (Handcuff) ও একটি ওয়াকিটকি (Walkie-talkie)।
ডিবি পুলিশের লোগোযুক্ত দুটি জ্যাকেট।
৫টি নিখুঁত ভুয়া আইডি কার্ড এবং ৭টি জাল গ্রেফতারি পরোয়ানা (Arrest Warrant)।
জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত একটি ডেক্সটপ কম্পিউটার, মনিটর এবং কালার প্রিন্টার (Color Printer)।
৭টি মোবাইল ফোন।
চক্রের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড গ্রেফতারকৃত ৫ যুবকই পার্শ্ববর্তী ত্রিশাল উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন— মো. সারোয়ার হোসেন (২৪), মো. রাকিবুল হাসান রনি (২৪), মো. শাহাদত হোসেন নয়ন (৩০), মো. সারোয়ার আলম (২৪) ও মো. আশরাফুল আলম (২৩)। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তারা এই ডিজিটাল প্রতারণার পথ বেছে নেয়।
পুলিশের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ সাইফ জানান, “এই চক্রটি অত্যন্ত ধূর্ত। তারা দিনের বেলায় বিভিন্ন এলাকা রেইকি (Reconnaissance) করে টার্গেট নির্ধারণ করতো এবং রাতে ‘অপারেশন’ পরিচালনা করতো। কখনো মাদকবিরোধী অভিযান, আবার কখনো রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে তারা বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিত।”
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে জানান, এই চক্রের নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ডিবি পুলিশের পরিচয়ে এ ধরণের কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দেখলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ থানায় খবর দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।