বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ঐতিহাসিক এই সাফল্যের পর প্রথাগত বিজয় মিছিল বা রাজপথের শক্তির মহড়া এড়িয়ে এক ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছে দলটি। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ‘শান্তির রাজনীতি’র বার্তা দিতে দেশব্যাপী দোয়া ও মোনাজাতের কর্মসূচি পালন করেছে নবনির্বাচিত এই শাসকদল।
বায়তুল মোকাররমে জনসমুদ্র ও প্রার্থনার সুর
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজ শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আয়োজিত হয় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত। এতে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মুসল্লিদের ঢল নামে। মোনাজাতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সম্প্রতি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেগম জিয়ার ত্যাগ ও দীর্ঘ সংগ্রামের অনুপ্রেরণাতেই এই ‘ন্যাশনাল ম্যানডেট’ (National Mandate) অর্জন সম্ভব হয়েছে।
প্রতিহিংসা বর্জন ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা
বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধারায় নির্বাচনের পর বিজয় মিছিল থেকে বিশৃঙ্খলা ও ‘রিটালিয়েশন’ (Retaliation) বা প্রতিহিংসার নজির দেখা গেলেও এবার বিএনপি সেই ধারা থেকে সচেতনভাবে সরে এসেছে। দলটির এই সিদ্ধান্তকে সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ সাধুবাদ জানিয়েছে। বায়তুল মোকাররমে আসা সাধারণ মুসল্লিরা গণমাধ্যমকে জানান, বিজয় মিছিলের পরিবর্তে মোনাজাতের এই সংস্কৃতি রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ‘ট্রান্সফরমেশন’ (Transformation) বা পরিবর্তন আনবে। এটি কেবল জনভোগান্তি কমাবে না, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও আগামীর প্রত্যাশা
নির্বাচনে জয়ের পর এখন সবার নজর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার নেতৃত্বে ‘তারেক যুগ’ শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মোনাজাতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমান তাঁর ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’ বা সংস্কারমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। বিশেষ করে সুশাসন (Governance), জবাবদিহিতা (Accountability) এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আধুনিকায়নে বিএনপি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
টেকসই উন্নয়ন ও আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
মোনাজাতে কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং দেশের সার্বিক মঙ্গল ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়। উপস্থিত মুসল্লিদের অনেকেই জানান, তারা চান নতুন সরকার দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Job Creation), আধুনিক ডাটা সেন্টার (Data Center) স্থাপন এবং আইটি সেক্টরে উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। দলমত নির্বিশেষে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে নিরাপদ বাংলাদেশ উপহার দেওয়াই হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
মোনাজাত শেষে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিএনপি কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের সরকার নয়, বরং ১৬ কোটি মানুষের সরকার হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রতিহিংসার পরিবর্তে প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমেই দেশ গড়ার এই ‘নিউ চ্যাপ্টার’ (New Chapter) এগিয়ে যাবে।