একটি সাধারণ ব্যালট পেপার যখন বাক্সে জমা পড়ে, তখন তা কেবল একজন প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে না, বরং লিখে দেয় একটি রাষ্ট্রের আগামী পাঁচ বছরের ভাগ্যলিপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ভোটগ্রহণ এবং বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর এখন জাতির চোখ বঙ্গভবনের দিকে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন ব্যালট বাক্স থেকে সরে গিয়ে আবর্তিত হচ্ছে সাংবিধানিক ‘প্রোটোকল’ (Protocol) এবং আইনি মারপ্যাঁচে। সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল—ভোট তো হলো, এখন সরকার গঠনের পরবর্তী ধাপগুলো কী? কীভাবে গঠিত হয় একটি নতুন ‘ক্যাবিনেট’ (Cabinet)?
বাংলাদেশের সংবিধান ও সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী সরকার গঠনের প্রতিটি স্তরে রয়েছে সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা। সেই জটিল অথচ আকর্ষণীয় প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আনুষ্ঠানিক ফলাফল ও গেজেট নোটিফিকেশন
ভোটগ্রহণ শেষে প্রিজাইডিং ও রিটার্নিং অফিসারদের মাধ্যমে ফলাফল যখন নির্বাচন কমিশনে (EC) পৌঁছায়, তখন শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশন প্রথমে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের নাম, ঠিকানা ও নির্বাচনী এলাকা উল্লেখ করে সরকারি ‘গেজেট’ (Gazette) প্রকাশ করে। এই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমেই একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সংসদ সদস্য হিসেবে আইনি বৈধতা নিশ্চিত হয়।
২. সংসদ সদস্যদের শপথ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
গেজেট প্রকাশের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। সাধারণত পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার এই শপথ পাঠ করান। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার না থাকলে সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি (যেমন প্রধান বিচারপতি) অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) শপথ পড়ানোর এখতিয়ার রাখেন। শপথ গ্রহণের পরই তারা আইনত পূর্ণাঙ্গ ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট’ (MP) হিসেবে স্বীকৃত হন।
৩. সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন
শপথ গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দলটি তাদের ‘সংসদীয় দলের’ (Parliamentary Party) বৈঠক ডাকে। সেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচন করেন। ত্রয়োদশ সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকেই সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হবে—এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের চিরাচরিত প্রথা।
৪. রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ
সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর সেই নাম আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে জানানো হয়। সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সেই সদস্যকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন, যাঁর প্রতি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা রয়েছে বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবে। এরপরই রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এটিই রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ (Diplomatic) ধাপ।
৫. মন্ত্রিসভা গঠন ও দফতর বণ্টন
প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পর শুরু হয় ‘ক্যাবিনেট ফরমেশন’ (Cabinet Formation)। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও তালিকা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীদের নিয়োগ দান করেন। এরপর বঙ্গভবনের দরবার হলে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হয়। শপথ গ্রহণ শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (Cabinet Division) থেকে 각 মন্ত্রীদের ‘পোর্টফোলিও’ (Portfolio) বা দফতর বণ্টন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
৬. প্রথম সংসদ অধিবেশন ও স্পিকার নির্বাচন
সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনের প্রথম কাজই হলো নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা। এর মাধ্যমেই একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ‘পলিসি মেকিং’ (Policy Making) প্রক্রিয়া গতিশীল হয়।
গণতান্ত্রিক এই মহাযজ্ঞের প্রতিটি ধাপ কেবল আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এক সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া। এখন কেবল অপেক্ষা বঙ্গভবনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা দেশ পরিচালনার গুরুভার কাঁধে তুলে নেবেন।