• জাতীয়
  • ‘মায়ের সমান’ সুন্দরবন রক্ষায় উত্তাল মোংলা: ভালোবাসা দিবসে বনের প্রতি অনন্য প্রেমের নজির

‘মায়ের সমান’ সুন্দরবন রক্ষায় উত্তাল মোংলা: ভালোবাসা দিবসে বনের প্রতি অনন্য প্রেমের নজির

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
‘মায়ের সমান’ সুন্দরবন রক্ষায় উত্তাল মোংলা: ভালোবাসা দিবসে বনের প্রতি অনন্য প্রেমের নজির

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘জাতীয় দিবস’ স্বীকৃতির দাবি; উৎসবমুখর পরিবেশে পশুর তীরের মানুষের অঙ্গীকার— ‘সুন্দরবন বাঁচলে, বাঁচবে দেশ’।

১৪ ফেব্রুয়ারি— বিশ্বজুড়ে যখন লাল গোলাপ আর ভালোবাসার আবহে ‘Valentine’s Day’ পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার মোংলায় ফুটে উঠল এক ভিন্নতর প্রেমের ছবি। প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে সঙ্গী করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হলো ‘সুন্দরবন দিবস’। উপকূলীয় মানুষের কাছে এই দিনটি কেবল উৎসবের নয়, বরং তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান রক্ষাকবচ ও ‘মায়ের সমান’ সুন্দরবনকে বাঁচানোর শপথ নেওয়ার দিন।

উৎসব আর প্রতিবাদের মিশেলে সুন্দরবন বন্দনা

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই মোংলা বন্দর সংলগ্ন পশুর নদীর তীরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ধরা (DHORA)’, ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ এবং ‘পশুর রিভার ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ’-এর যৌথ আয়োজনে এই দিবসটি এক বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হয়।

দিবসটির বিশেষ আকর্ষণ ছিল গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘লাঠি খেলা’ এবং বনের বাঘ লোকালয়ে চলে আসলে তাদের নিরাপদ উপায়ে বনে তাড়িয়ে দেওয়ার বিশেষ মহড়া। এছাড়া শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুন্দরবনের ‘Biodiversity’ বা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

‘মা’ বাঁচলে বাঁচবে উপকূল: পরিবেশ যোদ্ধাদের সতর্কবার্তা

জনসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট পরিবেশ যোদ্ধা ও ‘Environmental Activist’ শরীফ জামিল। তিনি তার বক্তব্যে সুন্দরবনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সুন্দরবন আমাদের কাছে কেবল একটি বন নয়, এটি আমাদের মায়ের মতো যা প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে আমাদের আগলে রাখে। কিন্তু আজ জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) এবং মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডে এই ‘Ecosystem’ আজ চরম বিপন্ন। বন সংলগ্ন এলাকায় দূষণ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ না করলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ সংকটে পড়বে।”

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ নূর আলম শেখ। তিনি সুন্দরবন দিবসকে দ্রুত ‘National Day’ বা জাতীয় দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জোরালো দাবি জানান। বক্তারা উল্লেখ করেন, সুন্দরবন না বাঁচলে দেশের দক্ষিণাঞ্চল অচিরেই মরুভূমিতে পরিণত হবে।

অস্তিত্বের সংকটে সুন্দরবন: কঠোর আইনের দাবি

সমাবেশে বক্তারা সুন্দরবনের বর্তমান সংকটের ব্যবচ্ছেদ করেন। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা (Salinity), নদী ভাঙন এবং অবৈধভাবে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ফলে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল আজ হুমকির মুখে। আলোচকরা দাবি করেন, সুন্দরবনের ওপর ‘Global Warming’-এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়া বনের সম্পদ আহরণে অপরিকল্পিত পদ্ধতি বন্ধ করে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সিডর-আইলার মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে এই বনই তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। তাই সুন্দরবনের প্রতি তাদের এই ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াই। মোংলার আকাশ-বাতাস এদিন স্লোগানে মুখরিত ছিল— "সুন্দরবন বাঁচাও, উপকূল বাঁচাও"।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি

সুন্দরবন রক্ষার এই আন্দোলনে কেবল পরিবেশবাদীরাই নন, একাত্মতা ঘোষণা করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। সমাবেশে বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তাদের দাবি, সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত রাখার পাশাপাশি এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান বা ‘Job Creation’-এর দিকেও নজর দিতে হবে।

বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের এই দিনে মোংলার মানুষের একটিই অঙ্গীকার— ‘সুন্দরবনকে ভালোবাসুন, সুন্দরবনকে বাঁচান’। দিনব্যাপী এই আয়োজন প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতির প্রতি নিবিড় প্রেমই পারে একটি অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

Tags: climate change biodiversity ecosystem global warming environmental protection mongla news pashur river sundarbans day tiger conservation national day